

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ, লাইফ সাপোর্টে থাকা ৯ বছরের শিশু হুজাইফা আফনান শুধু একটি নাম নয়। তার মাথার ভেতরে রয়ে যাওয়া গুলিটি আজ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ভেতর ঢুকে পড়া এক নিষ্ঠুর প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
এই গুলিটি কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে ছোড়া হয়নি। এটি পড়েছে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভেতরে, একটি শিশুর মাথায়, যে খেলছিল নিজের বাড়ির সামনে। তাহলে, সার্বভৌম রাষ্ট্র বলতে আমরা যা বুঝি, ছাপা হরফের সেই সার্বভৌমত্বে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কতটুকু কার্যকরী?
আন্তর্জাতিক রাজনীতির পাঠ্যবইয়ে সীমান্ত মানে একটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক শেষ রেখা। কিন্তু বাস্তবে দক্ষিণ এশিয়ার বহু সীমান্ত আজ ছিদ্রযুক্ত দেয়াল, যেখান দিয়ে ঢুকে পড়ে গুলি, মর্টার শেল, ড্রোন, এমনকি যুদ্ধ।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ছোড়া গুলিতে বাংলাদেশে শিশু আহত হওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়িতে মর্টার শেল পড়েছে, ঘরবাড়ি ভেঙেছে, মানুষ মারা গেছে।
একই চিত্র ভারতের সঙ্গেও-
বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত,
সীমান্তে ‘পুশ ইন’-এর নামে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন,
সীমান্তের ভেতরে ঢুকে হত্যা, তারপর দায় এড়ানোর সংস্কৃতি।
প্রশ্ন হলো-
যদি একটি দেশের ভেতরে অন্য দেশের অস্ত্র ঢুকে পড়ে, তবে সেই দেশের সার্বভৌমত্ব কোথায় দাঁড়িয়ে?
সার্বভৌমত্ব কেবল সংবিধানের অনুচ্ছেদে লেখা একটি শব্দ নয়।
এটি কার্যকর হয় তিনটি শর্তে-
সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা
কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়ার দৃঢ়তা
আন্তর্জাতিক মহলে রাষ্ট্রের অবস্থান
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দক্ষিণ এশিয়ার ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোতে এই তিনটিই প্রায়ই দুর্বল হয়ে পড়ে।
মিয়ানমারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ‘সংযম’ দেখাচ্ছে, কারণ-
একদিকে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বোঝা,
অন্যদিকে চীনের ভূরাজনৈতিক ছায়া,
আরেক পাশে আসিয়ান জোটের নীরবতা।
কিন্তু সংযম আর নীরবতা এক জিনিস নয়। নীরবতা বারবার হলে তা দুর্বলতার ভাষা হয়ে যায়।
জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থা, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, সবাই জানে রাখাইনে কী হচ্ছে। জানে সীমান্ত পেরিয়ে গোলা পড়ছে বাংলাদেশে।
তবু প্রশ্ন আসে- কেন কার্যকর কোনো চাপ নেই?
এর পেছনে তিনটি বাস্তবতা কাজ করে-
১. ‘স্ট্র্যাটেজিক ইগনোরেন্স’
মিয়ানমার একটি কৌশলগত অঞ্চল। ভারত, চীন, রাশিয়া- সবার স্বার্থ জড়িত। তাই মানবাধিকার এখানে প্রায়ই দ্বিতীয় সারিতে চলে যায়।
২. ভিকটিম রাষ্ট্রের ‘ওজন’
বাংলাদেশ বা অনুরূপ দেশগুলো বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে এমন অবস্থানে নেই, যেখানে একটি শিশুর মাথায় গুলি ঢোকার ঘটনা বিশ্বরাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
৩. সীমান্ত হত্যার ‘নরমালাইজেশন’
দক্ষিণ এশিয়ায় সীমান্তে মানুষ মারা যাওয়া এখন প্রায় রুটিন নিউজ। এমন নিয়মিত পূণরাবৃত্তিতে আন্তর্জাতিক বিবেকও ভোঁতা হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক সামরিক ভাষায় একটি ভয়ংকর শব্দ আছে, Collateral Damage
মানে, যুদ্ধের লক্ষ্য না হয়েও যারা মারা যায়।
কিন্তু, প্রশ্ন হলো- একটি শিশুকে কি যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বলা যায়?
যদিও, বিশেষঙ্গমহল এই ঘটনাকে দূর্ঘটনা ব্যতীরেকে Collateral Damage বলতে নারাজ।
যখন রাষ্ট্রগুলো দায় এড়াতে ব্যস্ত থাকে, তখন শিশুদের মাথায় গুলি ঢুকে পড়ে।
আর রাষ্ট্রীয় ভাষ্য হয়-
“তদন্ত চলছে”
“কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি দেখা হচ্ছে”
এই বাক্যগুলো শিশুটির লাইফ সাপোর্ট খুলে দিতে পারে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারি অধ্যাপক ড. সাইমা আহমেদ বলেন-
আমাদের সীমান্ত নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্য দূর্বলতায় ভূগছে। সীমান্তে অবৈধ প্রবেশ, পাচার ইত্যাদি ঠেকাতে আমরাও সফল হতে পারছি না। এছাড়া, এমন দূর্ঘটনা ঘটার পেছনে কিছু ইস্যু কাজ করে। আমাদের নীতিনির্ধারণে জন-নিরাপত্তা বরাবরই অবহেলিত।
আন্তর্জাতিক মহলের নজরদারির বিষয়ে তিনি বলেন, সত্যিকার অর্থেই এই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক সচেতনতা কম। এধরণের ঘটনাগুলো প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকায় তা নর্মাল অনুভূত হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতি এড়াতে, আমাদের পলিসি সু-সংগঠিত করা সবচেয়ে জরুরি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেন-
সীমান্ত হামলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে তুলে ধরা
শুধু প্রতিবাদ নোট নয়, জাতিসংঘে নিয়মিত ডকুমেন্টেশন দরকার।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ধারাবাহিক ন্যারেটিভ তৈরি।
একক ঘটনা নয়, প্যাটার্ন হিসেবে তুলে ধরা জরুরি।
সার্বভৌমত্বকে মানবিক ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত করা
এটি শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়- এটি শিশু অধিকার, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন।
আঞ্চলিক জোটে চাপ সৃষ্টি
আসিয়ান ও বিমসটেকের নীরবতা ভাঙতে কূটনৈতিক উদ্যোগ দরকার।
হুজাইফা আফনানের মাথায় রয়ে যাওয়া গুলিটি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রশ্ন নয়। এটি একটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং দূর্বল মানবতার প্রতীক।
যতদিন সীমান্তের গুলি রাষ্ট্রের ভেতরে ঢুকে পড়ে, যতদিন শিশুদের জীবন ‘ভূরাজনীতির ক্ষুদ্র ক্ষতি’ হিসেবে বিবেচিত হয়, ততদিন সার্বভৌমত্ব থাকবে মানচিত্রে- মানুষের জীবনে নয়।