ইশতেহারে তরুণদের অগ্রাধিকার: নিরাপত্তা, বাক্‌স্বাধীনতা ও কর্মসংস্থান

ইশতেহারে তরুণদের অগ্রাধিকার: নিরাপত্তা, বাক্‌স্বাধীনতা ও কর্মসংস্থান
প্রকাশিত

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে তরুণ ভোটারদের জন্য তিনটি মূল আশ্বাস—নিরাপত্তা, বাক্‌স্বাধীনতা এবং কর্মসংস্থান—কেন্দ্রীয় ভূমিকা পাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিটি ক্ষেত্রে তরুণদের দাবির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তবে বাস্তবায়ন কৌশল ও সময়সীমা নিয়ে বিতর্ক ও সংশয়ও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণরা শুধুমাত্র চাকরি চান না; তারা নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সামাজিক নিরাপত্তাও চান, যা অসামাজিক আচরণ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।

১) নিরাপত্তা: শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক নিরাপত্তাও

বাংলাদেশে তরুণদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর মধ্যে একটি হলো ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সামাজিক নিরাপত্তা—বিশেষ করে শহুরে বস্তি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে।

গত বছর বিভিন্ন এনজিও ও গবেষণা সংস্থা তরুণদের উপর নির্যাতন, চাকরিতে বৈষম্য, যৌন নিপীড়ন ও ঘরোয়া সহিংসতার মতো বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে—তরুণদের প্রায় ৬৮% ভাবেন, “আমি সুরক্ষিত পরিবেশে পড়াশোনা ও কর্মজীবন চালাতে পারি না।”

ইশতেহারে নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিশ্রুতি

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবার ইশতেহারে ঘোষণা করেছে—

  • শহর ও গ্রাম উভয়েই শিক্ষার্থীরা নিরাপদে চলাচল করতে পারবে এমন সড়ক নিরাপত্তা ও পাবলিক সেফটি নীতি

  • কর্মস্থলে শ্রমিক অধিকার ও যৌন হেনস্তা প্রতিরোধ আইন আরও শক্তিশালী করা

  • অনলাইন হেনস্তা ও ডেটা নিরাপত্তা রক্ষায় বিশেষ পুলিশ ইউনিট গঠন

বিশ্লেষকরা মনে করেন, নিরাপত্তা শুধু শারীরিক নয়; মানসিক ও ডিজিটাল নিরাপত্তাও তরুণদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত, যা ইশতেহারে এখনও পর্যাপ্তভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

২) বাক্‌স্বাধীনতা: প্রকাশের স্বাধীনতা ও বৈচিত্র্যময় মতামত

তরুণদের কাছে বাক্‌স্বাধীনতা শুধু লেখালেখি বা বক্তব্যের সংরক্ষণ নয়—এটি সামাজিক ন্যায়, সমালোচনার স্থান ও স্বচ্ছতার প্রতিও জড়িত।

গত কিছু বছরে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কর্মসূচি ও অনলাইন প্রচারণায় অংশ নিয়েছে—কিন্তু প্রতিবাদ, সমালোচনা বা মত প্রকাশে অনভিপ্রেত বাধা ও সন্ত্রাসী অ্যাক্টিভিটির খন্ডন তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

ইশতেহারে বাক্‌স্বাধীনতা নিয়ে প্রতিশ্রুতি

নিম্নলিখিত বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য—

  • সুশাসন আইনে উন্নয়ন, যাতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্র প্রশস্ত হয়

  • অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অভিযান ও সেন্সরশিপ কমিয়ে দমনমূলক আইনের প্রয়োগ পুনঃমূল্যায়ন

  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র সংগঠন ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা

বিশ্লেষকদের মতে, বাক্‌স্বাধীনতা ও সমালোচনামূলক চিন্তা তরুণ সমাজকে শুধু রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করবে না, বরং বৈচিত্র্যময় মতামতের মাধ্যমে দেশের নীতি নির্ধারণে তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে

৩) কর্মসংস্থান: ‘চাকরি’ নয়; টেকসই কর্মজীবন

চাকরি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তরুণদের সবচেয়ে সরাসরি ও জাতীয় ইস্যু। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে দেখা গেছে, যুব বেকারত্বের হার দেশের মোট বেকারত্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি।

তরুণদের চাকরির প্রত্যাশা শুধু একটি পদ পাওয়ার নয়;

  • যোগ্যতা অনুযায়ী আয়ের সুযোগ,

  • উদ্যোক্তা কারিকুলাম ও প্রশিক্ষণ,

  • টেকসই কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা,—এসব বিষয়টি তাদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনবে।

ইশতেহারে কর্মসংস্থান নিয়ে প্রতিশ্রুতি

ইশতেহারে বিভিন্ন দল তরুণদের জন্য উল্লেখ করছে—

  • আইটি, ডিজিটাল ইকোনমি ও স্টার্টআপ সেক্টরে অনুদান ও কর ছাড়

  • প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম

  • সরকারি প্রকল্পে তরুণদের অগ্রাধিকার ভিত্তিক নিয়োগ

  • মাইক্রো, স্মল ও মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ (MSME) সাপোর্ট

বিশ্লেষকরা মনে করেন, কেবল চাকরির সংখ্যা বৃদ্ধিই পর্যাপ্ত নয়—এর গুণমান, আয়বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা ও কাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে তরুণরা স্বাধীনভাবে জীবন গড়ে তুলতে পারবে।

বিশ্লেষণ: ইশতেহারের বাস্তবতা বনাম তরুণদের প্রত্যাশা

ইশতেহারে উল্লিখিত নিরাপত্তা, বাক্‌স্বাধীনতা ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতিগুলো তরুণদের নজর কাড়ছে। তবে বাস্তব রাজনীতি ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এখনো স্পষ্ট নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মামুন মুক্তা বলেন,

“তরুণরা শুধু প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে না—তাদের বিশ্বাসযোগ্য স্ট্র্যাটেজি ও টার্গেটড কর্মসূচি চাই। যদি ইশতেহারে ঘোষিত প্রকল্পগুলো বাস্তবে কার্যকর না হয়, তাহলে তরুণদের মধ্যে হতাশা আবার বাড়বে।”

একজন যুব উদ্যোক্তা ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন,

“আমরা চাই যে শুধু চাকরি নয়—কর্মসংস্থান, বাক্‌স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে দেখা যাক। ইশতেহার শুধু পেজে নয়, আমাদের জীবনের বাস্তবে কাজ করুক।”

উপসংহার

নিরাপত্তা, বাক্‌স্বাধীনতা ও কর্মসংস্থান—এই তিনটি হলো তরুণদের জীবনের নীতিগত মূল স্তম্ভ।
ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো ইতিবাচক হলেও এখন প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে—
-প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে?
-এটি কি তরুণদের জীবনের পরিবর্তন এনে দেবে, নাকি নির্বাচন পরবর্তী সময় আবারও প্রতিশ্রুতি সীমাবদ্ধ থাকবে?

যা-ই হোক—এই নির্বাচনেই তরুণরা নিজেদের ভোটের শক্তিকে অনচেনা এক জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, যদি তাদের প্রত্যাশা শুধু ইশতেহার না থেকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপান্তরিত হয়।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com