নির্বাচন ছাড়াও কি শাসনের বৈধতা তৈরি হচ্ছে?

বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্ষমতা, গ্রহণযোগ্যতা ও রাষ্ট্রীয় অনুমোদনের নতুন সমীকরণ
নির্বাচন ছাড়াও কি শাসনের বৈধতা তৈরি হচ্ছে?
প্রকাশিত

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার মৌলিক ভিত্তি হলো, শাসনের বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি থেকে, আর সেই সম্মতির প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম নির্বাচন। কিন্তু বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই ধারণা ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচন ছাড়াও কি শাসনের বৈধতা তৈরি হচ্ছে? যদি হয়ে থাকে, তা কোন উপায়ে, কতটা টেকসই এবং এর রাজনৈতিক মূল্যই বা কী?

এই প্রশ্নটি কেবল একটি তাত্ত্বিক বিতর্ক নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনা, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং নাগরিক-রাষ্ট্র সম্পর্কের কেন্দ্রীয় সংকটকে স্পর্শ করে।

শাসনের বৈধতা: ক্লাসিক ধারণা বনাম বাস্তবতা

রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুযায়ী শাসনের বৈধতার তিনটি প্রধান উৎস রয়েছে-

১) নির্বাচনী বৈধতা (Electoral legitimacy)

২) কার্যকর শাসন ও সেবা প্রদান (Performance legitimacy)

৩) রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীলতা (Control-based legitimacy)

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রথমটি প্রধান; কিন্তু কর্তৃত্ববাদী বা আধা-গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি ধীরে ধীরে মুখ্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় এই রূপান্তরটি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

নির্বাচন: আনুষ্ঠানিকতা বনাম গ্রহণযোগ্যতা

বাংলাদেশে নির্বাচন হচ্ছে, এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নির্বাচন কি এখনো বৈধতার প্রধান উৎস, নাকি এটি কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা?

ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বিতার সীমাবদ্ধতা, বিরোধী অংশগ্রহণের সংকট এবং নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সমাজের বড় অংশের অনাস্থা, সব মিলিয়ে নির্বাচনী বৈধতা দুর্বল হয়েছে।

ফলে শাসনের বৈধতা আর পুরোপুরি নির্বাচনের ওপর দাঁড়িয়ে নেই।

এই শূন্যস্থান পূরণ করছে অন্য কিছু উপাদান।

উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার বয়ান: বিকল্প বৈধতা

বাংলাদেশে শাসনের বৈধতা তৈরির সবচেয়ে শক্তিশালী বিকল্প মাধ্যম হয়ে উঠেছে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার বয়ান।

অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, সড়ক, ডিজিটাল সেবা, এসবকে রাজনৈতিক বৈধতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। যুক্তিটি পরিষ্কার:

“ভোট যাই হোক, আমরা কাজ করছি, এটাই বৈধতা।”

এই পারফরম্যান্স-ভিত্তিক বৈধতা মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়িক শ্রেণির একটি অংশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে। কিন্তু এটি একটি শর্তসাপেক্ষ বৈধতা, উন্নয়ন থামলেই এর ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রযন্ত্র ও নিয়ন্ত্রণের বৈধতা

বাংলাদেশে শাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

এখানে বৈধতা আসে ভয় বা আনুগত্য থেকে নয়, বরং ক্ষমতার অনিবার্যতা থেকে। নাগরিকরা অনেক সময় শাসনকে মেনে নেয়, কারণ তারা বিকল্প বা প্রতিরোধের বাস্তব পথ দেখতে পায় না।

এটি বৈধতার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রূপ, কারণ এটি সম্মতির নয়, বরং গ্রহণে বাধ্য হওয়ার ফল।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কূটনৈতিক বৈধতা

নির্বাচনী বৈধতা দুর্বল হলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে শাসনের বৈধতা অনেকাংশে নির্ভর করছে-

  • আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা

  • ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

  • আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির নীরব সমর্থন

যতদিন আন্তর্জাতিক মহল সরকারকে কার্যকর অংশীদার হিসেবে দেখে, ততদিন অভ্যন্তরীণ বৈধতার ঘাটতি আংশিকভাবে ঢেকে রাখা সম্ভব হয়।

আইনি বৈধতা বনাম নৈতিক বৈধতা

বাংলাদেশে শাসন আইনগতভাবে বৈধ, সংবিধান, আদালত ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে। কিন্তু নৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে আইনি বৈধতা একা টিকে থাকতে পারে না।

আইন মানা আর আইনকে ন্যায্য মনে করা, এই দুইয়ের মধ্যে ফারাক বাড়ছে। এই ফারাকই শাসনের গভীর সংকেত।

জনগণের নীরবতা: সম্মতি না ক্লান্তি?

অনেকে শাসনের বৈধতা প্রমাণ হিসেবে জনগণের নীরবতাকে তুলে ধরেন। কিন্তু এই নীরবতা কি সম্মতি, নাকি রাজনৈতিক ক্লান্তি?

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি অনেক বেশি দ্বিতীয়টি। দীর্ঘদিনের অনাস্থা, পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক বিকল্পের অভাব মানুষকে নীরব করেছে। নীরবতা বৈধতার শক্ত ভিত্তি নয়; এটি কেবল অস্থায়ী স্থবিরতা।

দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি

নির্বাচনবহির্ভূত বৈধতার ওপর দাঁড়িয়ে শাসন টিকে থাকলেও এর ঝুঁকি গভীর-

  • হঠাৎ সামাজিক বিস্ফোরণ

  • প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসের ভাঙন

  • তরুণদের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা

  • রাষ্ট্র ও সরকারের পার্থক্য মুছে যাওয়া

এই ঝুঁকিগুলো একসঙ্গে রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে দেয়।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com