

দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তার ঘটলেও নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ, শহর-গ্রামের বৈষম্য এবং ব্যয়জনিত সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে, এমন চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সাম্প্রতিক জরিপে।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিবিএসের সম্মেলন কক্ষে ‘আইসিটি ব্যবহারের সুযোগ ও প্রয়োগ’ শীর্ষক এ জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে দেশের ইন্টারনেট ও প্রযুক্তি ব্যবহারের বর্তমান অবস্থা, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং নারী-পুরুষের ব্যবহারের পার্থক্য তুলে ধরা হয়।
জরিপ প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বিবিএসের মহাপরিচালক মো. ফরহাদ সিদ্দিকসহ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কর্মকর্তারা।
জরিপে দেখা গেছে, দেশে মোট জনসংখ্যার ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এর মধ্যে পুরুষ ব্যবহারকারীর হার ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ, আর নারী ব্যবহারকারী ৫০ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ এখনো দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী ইন্টারনেট সেবার বাইরে রয়ে গেছেন, যা ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির পথে বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শহর ও গ্রামের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারে বড় ধরনের বৈষম্যও স্পষ্ট হয়েছে জরিপে। শহর এলাকায় যেখানে ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, সেখানে গ্রামে এ হার মাত্র ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে দুই অঞ্চলের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ১ শতাংশে, যা দেশের ডিজিটাল ব্যবস্থার অসম বিকাশকে নির্দেশ করে।
ইন্টারনেট ব্যবহারের পাশাপাশি মোবাইল ফোন ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেলেও ব্যক্তিগত মালিকানায় এখনো ঘাটতি রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও নিজস্ব মোবাইল রয়েছে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশের। অন্যদিকে কম্পিউটার ব্যবহারের হার এখনো সীমিত মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ কম্পিউটার ব্যবহার করেন।
অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রযুক্তি ব্যবহারে ঢাকার অবস্থান সবচেয়ে এগিয়ে। বিপরীতে পঞ্চগড়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার সবচেয়ে কম। একইভাবে কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ঢাকার পরিবারগুলো এগিয়ে থাকলেও ঠাকুরগাঁও সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে, যা আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে।
ইন্টারনেট ব্যবহারের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি চাকরি সংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধানই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। গত তিন মাসে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যবহারকারী এ ধরনের তথ্য খুঁজেছেন। পাশাপাশি ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যবহারকারী খেলাধুলা সংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধান করেছেন। অনলাইনে কেনাকাটার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম, যেখানে মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যবহারকারী এই সেবা গ্রহণ করেছেন।
ডিজিটাল দক্ষতার ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের বড় অংশ এখনো মৌলিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। জরিপ অনুযায়ী, ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যবহারকারী কপি-পেস্ট করতে পারেন, যা সবচেয়ে প্রচলিত ডিজিটাল দক্ষতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে উন্নত দক্ষতার ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্ট।
সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতার কিছু ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে। ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, সাইবার আক্রমণের শিকার হলে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সক্ষম। তবে ঝুঁকির দিকও রয়েছে ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবহারকারী ভাইরাস ও ম্যালওয়্যারকে ইন্টারনেট ব্যবহারের সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, ইন্টারনেট সেবার উচ্চমূল্য ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। জরিপে অংশ নেয়া ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, ব্যয়বহুল হওয়ায় তারা ইন্টারনেট ব্যবহারে অনাগ্রহী।