

বাংলাদেশে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ এখনো চরম দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছেন। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও আয় কমে যাওয়ার চাপে দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে এই জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা কী—এ প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলের বিষয় নয়; এটি নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তনের আশার জায়গা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার সামগ্রিকভাবে কিছুটা কমলেও চরম দারিদ্র্য এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল, নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা, শহরের বস্তি ও শিল্পাঞ্চলের অনিয়মিত শ্রমিকদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি।
অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, কোভিড-পরবর্তী ধাক্কা, বৈশ্বিক মন্দা, ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি পড়েছে দরিদ্র মানুষের জীবনে। আয় বাড়েনি, কিন্তু ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দারিদ্র্যের হার কমেছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, চরম দারিদ্র্য এখনও নির্মমভাবে টিকে আছে। এই বৈপরীত্য কেবল পদ্ধতিগত নয়; এটি নীতিগতও।
যখন দ্রব্যমূল্য বাড়ে দ্বিগুণ, অথচ আয় বাড়ে না—তখন দারিদ্র্য ‘পরিসংখ্যানগত’ভাবে কমলেও বাস্তব জীবনে তা গভীর হয়। শহরের বস্তি, গ্রামীণ চরাঞ্চল কিংবা শিল্পাঞ্চলের অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক—সবখানেই একই গল্প: কাজ অনিশ্চিত, আয় অপ্রতুল, জীবন অনিরাপদ।
দ্রব্যমূল্যের প্রশ্নে রাষ্ট্র বারবার বলছে—বাজার আন্তর্জাতিক বাস্তবতার শিকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক অজুহাতে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার দায় এড়ানো যায় কি?
নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ‘বাজার’ মানে অর্থনীতি নয়, বরং সকালের খাবার জুটবে কি না—সেই দুশ্চিন্তা। অথচ নির্বাচনী আলোচনায় বাজার ব্যবস্থাপনা প্রায়ই স্লোগাননির্ভর, বাস্তব পরিকল্পনাহীন।
নতুন বাংলাদেশ গড়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু কর্মসংস্থান ছাড়া সেই বাংলাদেশ কাদের জন্য?
যুব বেকারত্ব, আংশিক কর্মসংস্থান ও অনানুষ্ঠানিক খাতের বিস্তার দেখিয়ে দেয়—উন্নয়ন এখনও শ্রমবান্ধব হয়নি। বিনিয়োগ বাড়লেও তার সুফল শ্রমজীবী মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছাচ্ছে, সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই।
নির্বাচনী ইশতেহারে ‘লাখো চাকরি’ প্রতিশ্রুতি নতুন নয়। নতুন দরকার হচ্ছে—কীভাবে সেই চাকরি নিরাপদ হবে, মজুরি হবে বাসযোগ্য, আর শ্রমিক হবে মর্যাদাসম্পন্ন।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এখনও অনেকের কাছে অধিকার নয়, বরং রাজনৈতিক অনুগ্রহ। তালিকাভুক্তির রাজনীতি, লিকেজ ও বৈষম্য চরম দারিদ্র্য বিমোচনের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদি নতুন সরকার সত্যিই দারিদ্র্য দূর করতে চায়, তাহলে ভর্তুকি ও সহায়তাকে দয়া নয়—সংবিধানিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে।
নির্বাচন কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানেরও পরীক্ষা। চরম দারিদ্র্য ও নিম্ন আয়ের মানুষের সংকট উপেক্ষা করে কোনো নির্বাচনই প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক বা অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না।
‘নতুন বাংলাদেশ’ যদি সত্যিই পুরোনো ব্যর্থতা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, তাহলে তাকে প্রথমেই প্রশ্ন করতে হবে—
উন্নয়ন কার জন্য, বাজার কার নিয়ন্ত্রণে, আর রাষ্ট্র কার পাশে?
নিম্ন আয়ের মানুষের সবচেয়ে বড় অভিযোগ—দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে নেই। চাল, ডাল, তেল, সবজি, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
একই সঙ্গে বেকারত্ব ও আংশিক কর্মসংস্থান বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। তৈরি পোশাক খাত, নির্মাণ শ্রম ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় কাজের সুযোগ কমেছে। যারা কাজ পাচ্ছেন, তাদের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে—যেখানে নেই চাকরির নিরাপত্তা, নেই ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা।
শ্রম বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়—টেকসই ও সম্মানজনক কাজ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ‘নতুন বাংলাদেশ’ মানে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়। তাদের প্রত্যাশা খুবই বাস্তব ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত—
দ্রব্যমূল্যের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ
কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, বিশেষ করে যুবকদের জন্য
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিস্তৃতি ও দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানো
শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করা
ঢাকার একটি বস্তির বাসিন্দা রিকশাচালক বলেন, “নির্বাচন আসে যায়, কিন্তু পেটের কষ্ট থেকেই যায়। আমরা চাই কাজ থাকুক, বাজারে গেলে ভয় না লাগুক।”
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী ইশতেহারে দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি নতুন নয়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—সেগুলোর বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হবে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, নতুন সরকারের জন্য তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে—
১) বাজার ব্যবস্থাপনায় শক্তিশালী নজরদারি,
২) বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি,
৩) সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে লক্ষ্যভিত্তিক সংস্কার।
নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা—চরম দারিদ্র্য ও নিম্ন আয়ের মানুষের সংকটকে অবহেলা করলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সংহতি দুটোই ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তাদের মতে, ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়তে হলে উন্নয়নের সুফল যেন কেবল পরিসংখ্যানেই নয়, বাস্তব জীবনে দরিদ্র মানুষের টেবিলে খাবার হিসেবে পৌঁছায়—সেটিই হবে আসল পরীক্ষা।
আসন্ন নির্বাচন তাই নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে শুধু ভোট দেওয়ার দিন নয়; এটি তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রামে পরিবর্তনের একটি সম্ভাব্য মোড়।
৩০ লাখ মানুষ শুধু ভোটার নন—তারা রাষ্ট্রের বিবেক। তাদের ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনা যদি নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রে না আসে, তবে যে সরকারই আসুক, দারিদ্র্য কমবে কাগজে—বাস্তবে নয়।
নতুন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তাই আকাশছোঁয়া প্রকল্প নয়; বরং সেই মানুষটির জীবন, যিনি প্রতিদিন হিসাব কষেন—আজ খাওয়ার পর কাল বাঁচা যাবে কি না।