শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকলে পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়: সেনাপ্রধান

শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকলে পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়: সেনাপ্রধান
প্রকাশিত

শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকলে পররাষ্ট্রনীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।

বৃহস্পতিবার ২৩ এপ্রিল ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ‘ক্যাপস্টোন কোর্স ২০২৬/১’ এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, কক্সবাজার বা চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিমান বাহিনীর শক্তিশালী অবস্থান থাকলে রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টি হত না।

সামরিক সরঞ্জামের ‘অপর্যাপ্ততার’ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুদ্ধ এড়ানোর জন্যও পর্যাপ্ত প্রস্তুতি প্রয়োজন।

এই কোর্সে মোট ৪৫ জন ফেলো অংশগ্রহণ করেন, যাদের মধ্যে ছিলেন পাঁচজন সংসদ সদস্য, জ্যেষ্ঠ সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি, কূটনীতিক এবং করপোরেট প্রতিনিধি।

এসময় সেনাপ্রধান বলেন, “আমি আপনাদের সামরিক বিষয়াবলীতে—সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর—আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত করি। কারণ এগুলো জাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং এগুলোর সক্ষমতা সম্পর্কে জানার অধিকার আপনাদের রয়েছে।

“যেমন বাংলাদেশ নৌবাহিনী আমাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী। আমরা ব্যাপকভাবে আমদানি ও রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল এবং আমাদের সমুদ্রপথের যোগাযোগ রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। নৌবাহিনীকে শক্তিশালী না করলে এই যোগাযোগ ব্যবস্থা সুরক্ষিত থাকবে না।”

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, “আপনারা কল্পনা করতে পারেন এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। নৌবাহিনীর সীমাবদ্ধতা রয়েছে; তাদের পর্যাপ্ত ওপিভি নেই। ফলে ছোট করভেট দিয়ে সাগরে টহল দিতে হচ্ছে যা অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী নয়। আমাদের সমুদ্রপথ এবং জাহাজগুলোর সুরক্ষায় নৌবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

“একইভাবে বিমানবাহিনীর কথা যদি বলি, দীর্ঘ সময় ধরে আমরা মাল্টি-রোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট ক্রয় করিনি। যদি কক্সবাজার বা চট্টগ্রাম এলাকায় আমাদের পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা থাকত, তবে হয়ত এই রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টিই হত না।”

২০১৭ সালের অগাস্টে মিয়ানমারে সহিংস সামরিক অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। জাতিসংঘ ওই ঘটনাকে ‘জাতিগত নিধনের ধ্রুপদী উদাহরণ’ হিসেবে বর্ণনা করে।

এরপর আরো কয়েক দফায় বাংলাদেশে এসেছে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলিয়ে বর্তমানে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছে। ফলে ওই এলাকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে পরিণত হয়েছে।

তাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানের ফলে স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। মিয়ানমারের পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় রোহিঙ্গাদের ফেরানোর কোনো উদ্যোগই কাজে আসেনি।

সেনাপ্রধান বলেন, আজ আপনি যদি এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন, তবে ভবিষ্যতে হয়ত ৫০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে। কথায় আছে—’সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়।’ আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিই, যুদ্ধ করার জন্য নয়, বরং যুদ্ধ এড়ানোর জন্য। শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকলে পররাষ্ট্রনীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলেও মন্তব্য করেন সেনাপ্রধান।

তিনি বলেন, “এই দুটি বিষয় একে অপরের পরিপূরক। এ কারণেই আমি আপনাদের সবসময় সামরিক বিষয়াবলীতে আগ্রহী হতে উৎসাহিত করি। আমরা সবসময় জাতির কাছে দায়বদ্ধ থাকতে চাই। আমরা এমন একটি প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তুলতে চাই যা আমাদের সম্ভাব্য শত্রুদের জন্য কার্যকর প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করবে।

“যে অর্গানাইজেশনের জবাবদিহিতা নাই, সে অর্গানাইজেশন কখনোই গ্রো করবে না। আমরা চাই আমাদের মিলিটারি সব সময় জবাবদিহিতার মধ্যে থাকবে।”

সেনাপ্রধানের বক্তব্যে সাম্প্রতিক তেল সংকটের প্রসঙ্গও আসে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও দেশে তেল শোধনের পর্যাপ্ত সক্ষমতা তৈরি না হওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করেন তিনি।

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, “আমরা এক চ্যালেঞ্জিং পৃথিবীতে বাস করছি; প্রতিদিন নতুন নতুন সমস্যা সামনে আসছে। এনডিসিতে আসার পথে আমি দেখলাম মানুষ জ্বালানি তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে।

“এখানেই জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি চলে আসে। জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে তা অত্যন্ত স্পষ্ট। আমাদের একটি মাত্র রিফাইনারি (ইস্টার্ন রিফাইনারি) আছে যা মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করতে পারে। বাকি সব জ্বালানি আমাদের পরিশোধিত অবস্থায় চড়া দামে আমদানি করতে হয়।”

তিনি বলেন, “স্বাধীনতার ৫৫ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আমরা ইস্টার্ন রিফাইনারির উন্নয়ন করিনি বা দ্বিতীয় কোনো রিফাইনারি তৈরি করিনি। রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল অনেক সস্তা হওয়া সত্ত্বেও রিফাইনারির অভাবে আমরা তা ব্যবহার করতে পারছি না। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা এদেশের প্রতিটি মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন।”

এনডিসির কমান্ড্যান্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. ফয়জুর রহমান জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সংলাপ ও ঐকমত্য গঠনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “কোর্স চলাকালে ফেলোদের সক্রিয়, চিন্তাশীল ও শ্রদ্ধাশীল অংশগ্রহণ কৌশলগত বোঝাপড়া সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের নেতৃত্বের মধ্যে একটি শক্তিশালী জাতীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সহায়ক হয়েছে।”

ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের অন্যতম প্রধান কোর্স হিসেবে ক্যাপস্টোন কোর্সটি কৌশলগত সচেতনতা বৃদ্ধি, সমালোচনামূলক চিন্তাধারা বিকাশ, আন্তঃবিষয়ক সহযোগিতা জোরদার এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়ন বিষয়ক একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com