বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলে ক্ষুব্ধ টিআইবি

বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলে ক্ষুব্ধ টিআইবি
প্রকাশিত

সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয় বিষয়ক দুইটি অধ্যাদেশ বাতিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের নামে স্থগিতের সুপারিশে ক্ষুব্ধ ও হতাশ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

এই অধ্যাদেশ তিনটি হুবহু বিল আকারে উত্থাপনের দাবি জানিয়ে দুর্নীতি দমন কশিমন, পুলিশ কমিশন ও তথ্য অধিকারবিষয়কসহ স্থগিতের সুপারিশপ্রাপ্ত বাকি অধ্যাদেশগুলোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে অবিলম্বে আইনে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

আজ শুক্রবার দেওয়া বিবৃতিতে টিআইবি এই আহ্বান জানায়।

বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারিকৃত ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যে গুটিকয়েক ক্ষেত্রে দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেছিল, তার মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ অন্যতম। এই তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল ও স্থগিতের মাধ্যমে সরকার আসলে কী বার্তা দিতে চায়?

‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে “বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ...বিচারব্যবস্থা সংস্কারের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন পৃথক সচিবালয়কে আরও শক্তিশালী করা হবে” মর্মে যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, এই কী তার নমুনা? নাকি পরিস্থিতি বিবেচনা করে জনরায়কে প্রভাবিত করার অংশ হিসেবে ক্ষমতাসীন দল “শুধুমাত্র কথার কথা” হিসেবেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসংক্রান্ত অঙ্গীকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করেছিল! বিগত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে বিচার বিভাগ কতটা কলুষিত ও বিরুদ্ধ মত দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, তা এত অল্প সময়ের ব্যবধানে সরকার ভুলে গেল! যা খুবই হতাশাজনক।’

ড. জামান আরও বলেন, ‘একইভাবে একটি কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গঠন হওয়ার যে সমূহ সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছিল, এক্ষেত্রে অধ্যাদেশটি স্থগিত হওয়ার ফলে উদ্বেগজনক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল। মানবাধিকার কমিশন ও বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত বিধানের অভাবে মানুষের জীবন কতটা দুর্বিসহ হয়ে উঠতে পারে, তা ক্ষমতাসীন দলের প্রধানসহ কর্তাব্যক্তিদের বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়! একইসঙ্গে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দলের জন্য এ অবস্থান আত্মঘাতীমূলক। কারণ তারা প্রায় সবাই ওই ক্ষেত্রগুলোতে আইনগত দুর্বলতা, বিশেষ করে বিচার বিভাগ ও মানবাধিকার কমিশনের মতো সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণের মাধ্যমে অকার্যকরতার ফলে বহুমাত্রিক অধিকার হরণের ভুক্তভোগী। যদি তারা কর্তৃত্ববাদ ও রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করে থাকেন, তবে অধ্যাদেশগুলো হুবহু বিল আকারে অবিলম্বে সংসদে অনুমোদনের উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে দেশবাসীকে তার প্রমাণ দেওয়া উচিত।’

বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সময় গুম-খুনের শিকার হওয়া একটি দলের সরকার কীভাবে গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত দুইটি অধ্যাদেশকেও কোন যৌক্তিকতায় এবং কাদের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের ফাঁদে ফেলে দিলো—সেই প্রশ্ন তুলে নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘আইনে কোনো অর্ন্তনিহিত দুর্বলতা থাকলে সেটি অবশ্যই দূর করা যেতে পারে। কিন্তু যাচাই-বাছাইয়ের নামে গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত পক্ষগুলোকে সুবিধা বা দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা বা বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের অনুমতির নামে কিংবা ‘জাতীয় নিরাপত্তার’ অজুহাত তুলে এটিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দুর্বল করা হয়, তা শুধু আত্মঘাতীই হবে না, বরং দেশে কার্যকর মানাবাধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে পেছনে হাঁটার শামিল।’

দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশের উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দুদক সংস্কার কমিশনের যেসব সুপারিশের ক্ষেত্রে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিসহ জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং জুলাই সনদের বাইরে দুদক সংস্কার কমিশনের যেসব প্রস্তাবে বিএনপি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে লিখিতভাবে সমর্থন জানিয়েছে, সেগুলোর আলোকে দুদক অধ্যাদেশটি সংশোধন করে অবিলম্বে বিল আকারে চলতি সংসদে উত্থাপনের আহ্বান জানাই। এক্ষেত্রে দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ “একটি স্বাধীন বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি” সৃষ্টির বিধান, যে ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হওয়া সত্ত্বেও অধ্যাদেশে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছিল।’

পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ বাতিলের আহ্বান জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘পুলিশকে একটি জনবান্ধব ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন গঠন প্রয়োজন, তার কোনো প্রতিফলনই অধ্যাদেশটিতে হয়নি, যা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে প্রস্তাবিত বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সুপারিশ ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একইসঙ্গে অবিলম্বে দলনিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে দায়িত্বপালনে সক্ষম এমন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর তথ্য কমিশন গঠনের উদ্যোগসহ “তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬”-এ তথ্যের সংজ্ঞা, কর্তৃপক্ষের আওতা বৃদ্ধি, কমিশনারদের নিয়োগ, পদমর্যাদা, মেয়াদ প্রভৃতি বিষয় সংশোধন সাপেক্ষে সংসদে বিল আকারে উত্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে উল্লিখিত অধ্যাদেশগুলোসহ স্থগিতের সুপারিশপ্রাপ্ত সব অধ্যাদেশগুলোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে আইনে পরিণত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com