

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের এই সংস্থাগুলোর নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। যা আগামী বছরের শুরুর দিক পর্যন্ত চলবে। তবে কোন নির্বাচন আগে হবে, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি ইসি।
প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইসি পাঁচটি স্থানীয় সরকার সংস্থা—সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের জন্য অভিন্ন বিধিমালা প্রণয়ন করছে। বর্তমানে এ নির্বাচনগুলোর আচরণবিধি স্তরভেদের ভিন্ন ভিন্ন। বিধিমালা তৈরির এ কাজ আগামী জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
গত ১৪ মে ইসির আইন ও বিধি সংস্কার কমিটি দ্বিতীয় বৈঠক করে। বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধি পরিবর্তন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা, সেনা মোতায়েন, প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বৃদ্ধি, নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা বাড়ানো, প্রার্থিতা সংক্রান্ত শর্ত ও ইসির সামগ্রিক প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতার আশঙ্কা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ইসির অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘আমরা নির্বাচনগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে করব। বিভিন্ন এলাকায় আলাদাভাবে ভোট হবে, একসঙ্গে নয়।’
সহিংসতা বাড়লে সেনা মোতায়েন প্রয়োজন হবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ধরুন, আমরা ঢাকা বিভাগে নির্বাচন করছি, সেখানে পুলিশ কাজ করবে। আমরা সেনা মোতায়েনের পক্ষে নই। সেনাবাহিনী থাকলেও তারা স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করবে।’
‘যদি দেখি সেনাবাহিনী প্রয়োজন, তাহলে আমরা তাদের ডাকব। কোনো এলাকায় ঘটনা বাড়লে পরবর্তী ধাপে যৌক্তিকতা দেখিয়ে সেনাবাহিনী ডাকা হবে,’ যোগ করেন তিনি।
দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বেশিমাত্রায় সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে উল্লেখ করে মাছউদ বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করব যাতে স্থানীয় নির্বাচনে কোনো প্রাণহানি না ঘটে। কোনো ঘটনা ঘটলেও তা খুব সীমিত রাখার চেষ্টা করব।’
স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের সঙ্গে ইসি বৈঠকে বসবে বলে জানান তিনি। বলেন, ‘আমাদের এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে নির্বাচন রক্তপাতহীন হয়। আমরা দলগুলোর সঙ্গে বসব। যদিও এসব নির্বাচন প্রযুক্তিগতভাবে নির্দলীয়, তবে বাস্তবে এখন আর কিছুই নির্দলীয় নয়। আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা দলভিত্তিক হয়ে গেছে—স্কুল-কলেজেও শিক্ষকদের রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয়।’
প্রার্থীদের সতর্ক করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের সতর্ক করব, তারা যে দলেরই হোক, সীমা অতিক্রম করতে পারবে না। এ বিষয়ে তাদের অঙ্গীকার করতে হবে।’
স্থানীয় নির্বাচন প্রস্তুতি প্রসঙ্গে মাসুদ বলেন, ‘আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে চাই। বিধিমালার কাজও জুনের মধ্যে শেষ হবে।’
বাংলাদেশের স্থানীয় নির্বাচনের ইতিহাসে সেনাবাহিনী মোতায়েনের নজির নেই। তবে ২০১১ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাঁচ দিনের জন্য সেনা মোতায়েন চেয়ে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে অনুরোধ করেছিল তৎকালীন ইসি।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য আবদুল আলীম বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনে সাধারণত সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন হয় না।’
নাসিক নির্বাচনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘ওই নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের আবেদন সরকার নাকচ করেছিল।’
আবদুল আলীম ব্যাখ্যা করেন, ‘জাতীয় নির্বাচন একদিনে হয়, তাই তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা খুব কঠিন। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে হয়। ভালো পরিকল্পনা থাকলে সেনাবাহিনী ছাড়াই নির্বাচন করা সম্ভব।’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘একই সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় আমাদের স্থানীয় নির্বাচনে সহিংসতা বেশি হয়। সেটিও মাথায় রাখতে হবে।’
এদিকে গত ১৮ মে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো মানসম্পন্ন হতে হবে।’
তিনি অতীতের সহিংসতার উদাহরণ তুলে ধরেন। ২০১৬ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ২৩৬ জন ও ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১১৬ জন নিহত হয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘এই সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। সংঘর্ষ ঠেকানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা রক্তপাত চাই না।’
শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিতে সচেতনতামূলক প্রচারণা, অংশীজনদের সম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন সিইসি। ‘তাদের সহযোগিতা ছাড়া সংঘর্ষমুক্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্ভব নয়,’ তিনি বলেন।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়নি। অনেক প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় নির্বাচন আয়োজনে চাপের মুখে রয়েছে কমিশন।
বর্তমানে বাংলাদেশে ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৬১টি জেলা পরিষদ, ৫০০টি উপজেলা পরিষদ এবং ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে মে মাসের শেষে ১ হাজার ৪২৯টির নির্বাচন উপযোগী মেয়াদ পূর্ণ হবে। আর আগামী নভেম্বরের মধ্যে ৩ হাজার ৮৪৯টির মেয়াদ পূর্ণ হবে।
বিভিন্ন জটিলতার কারণে ১০৪টি ইউনিয়ন পরিষদ এখনো নির্বাচনের অনুপযোগী রয়েছে।
ইসির তথ্য বলছে, এর মধ্যে ৭৯টি আইনি জটিলতায়, ১৮টি সীমানা-সংক্রান্ত সমস্যায় এবং সাতটি ভোটার তালিকা জটিলতায় আটকে আছে।