

“জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট- ২০২৬”, নানা কারণে ছিলো বিশ্বব্যাপী এক আলোচিত অধ্যায়। নির্বাচন শেষ হয়ে ইতোমধ্যে নতুন সরকারের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবুও থামেনি আলোচনা-বিশ্লেষণের আবহ। ১৯ ফেব্রুয়ারি, কাতার ভিত্তিক গণমাধ্যম ‘আল-জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে গণভোট ইস্যুতে রাজনৈতিক উত্তপ্ততার কথা।
“জুলাই ন্যাশনাল চার্টার ২০২৫” নামে পরিচিত এই সংস্কার প্রস্তাব ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ ভোটে অনুমোদিত হয়েছে। তবে ফল ঘোষণার পর বিজয়ী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলবার নবনির্বাচিত বিএনপি সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে সংস্কার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরিদের জন্য সংরক্ষিত কোটার বিরোধিতা থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান নেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)-এর তথ্যমতে, সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ জন নিহত এবং ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। তিনি বর্তমানে ভারতে নির্বাসনে আছেন।
তার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ–কেও রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। সাম্প্রতিক নির্বাচন ছিল সেই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন।
শেখ হাসিনার পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস।
তার নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার “জুলাই ন্যাশনাল চার্টার ২০২৫” প্রণয়ন করে। এতে ৮০টিরও বেশি প্রস্তাব রয়েছে, যার লক্ষ্য-
নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি
মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুরক্ষা
এ ছাড়া, বর্তমান একক কক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদের পাশাপাশি ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে ৩৫০ সদস্যের জাতীয় সংসদই একমাত্র আইনসভা।
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ নিতে বলা হয়-
১. সংবিধান রক্ষার শপথ
২. জুলাই চার্টার বাস্তবায়নের শপথ
বিএনপি সংসদ সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ গ্রহণ করেননি। তাদের দাবি, সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল এখনো সংসদে অনুমোদিত হয়নি, তাই এ কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংসদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া কাউন্সিলের বৈধতা নেই। তবে দলটি চার্টার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে নির্বাচন হয় ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (FPTP) পদ্ধতিতে। এতে প্রতিটি আসনে সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থী বিজয়ী হন। এই পদ্ধতিতে ভোটের শতকরা হার ও আসনসংখ্যার মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয়ী হয়েছে, আর জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন (২৯৭টি ঘোষিত আসনের মধ্যে)।
জুলাই চার্টার প্রস্তাব করছে, উচ্চকক্ষ গঠিত হবে অনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation) পদ্ধতিতে, অর্থাৎ দলগুলোর মোট ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন হবে।
বিএনপি চায় উচ্চকক্ষ গঠিত হোক বর্তমান আসনসংখ্যার অনুপাতে (অর্থাৎ সংসদে যাদের বেশি আসন, তাদেরই বেশি প্রতিনিধিত্ব)। অন্যদিকে জামায়াত ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) চায় অনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি অনুসরণ করা হোক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুলের মতে, “মূল ইস্যুগুলোতে বড় দলগুলোর ঐকমত্য থাকলেও উচ্চকক্ষ গঠন পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধই এখন প্রধান বাধা।”
সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল গঠনের ১৮০ দিনের মধ্যে চার্টারের প্রস্তাব বাস্তবায়নের কথা। কিন্তু অধিকাংশ সংসদ সদস্য দ্বিতীয় শপথ না নেওয়ায় কাউন্সিল এখনো গঠিত হয়নি।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সংসদ কি প্রথমে কাউন্সিলকে বৈধতা দেবে, নাকি রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে নতুন সমাধান খোঁজা হবে?
গণভোটে অনুমোদন পাওয়া চার্টার এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঐকমত্যের দলিল, নাকি নতুন বিভাজনের সূচনা, সেটিই সময় বলে দেবে।