‘আমার দেশ’ -এর প্রতিবেদনকে অনুমাননির্ভর দাবি করে বিজিবির প্রতিবাদ

সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তথ্যগত বিভ্রান্তির অভিযোগ; সঠিক তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানালো বিজিবি
‘আমার দেশ’ -এর প্রতিবেদনকে অনুমাননির্ভর দাবি করে বিজিবির প্রতিবাদ
প্রকাশিত

‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত “দুই দেশের বিবৃতিতে রহস্যময় ফারাক” শীর্ষক প্রতিবেদনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বাহিনীটির দাবি, ১৪ জুন ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন সম্পর্কে যে তথ্য, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে, তার উল্লেখযোগ্য অংশ অনুমাননির্ভর এবং প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে অসম্পূর্ণ ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

একটি বিস্তারিত ব্যাখ্যায় বিজিবি জানায়, সম্মেলন-পরবর্তী যৌথ প্রেস বিবৃতি এবং বিজিবির পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মধ্যে পার্থক্যকে কেন্দ্র করে প্রতিবেদনে যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বাহিনীটির ভাষ্য অনুযায়ী, যৌথ বিবৃতি সাধারণত সম্মেলনের একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ, আর বিজিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জয়েন্ট রেকর্ড অব ডিসকাশনস (জেআরডি)-এর ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত ও আলোচ্য বিষয়গুলোর বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে যৌথ বিবৃতিতে “সীমান্ত হত্যা” শব্দের পরিবর্তে “সীমান্তে সংঘটিত মৃত্যু” শব্দবন্ধ ব্যবহারের বিষয়টি বিজিবির অবস্থানের দুর্বলতার ইঙ্গিত হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, বিজিবি তা প্রত্যাখ্যান করেছে। বাহিনীটির দাবি, সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক দলিল জেআরডিতে “কিলিং” শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।

বিজিবি আরও জানায়, প্রতিবেদনে এমন ধারণা দেওয়া হয়েছে যে পুশ-ইন, সীমান্ত হত্যা, সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণ, মাদক চোরাচালান, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রমের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বৈঠকে গুরুত্ব পায়নি। তবে এসব বিষয় শুধু আলোচিতই হয়নি, বরং জেআরডিতে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলেও দাবি করেছে বাহিনীটি।

যৌথ প্রেস বিবৃতি ও পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির পার্থক্যকে “রহস্যময়” হিসেবে উপস্থাপনের সমালোচনা করে বিজিবি বলেছে, আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় সম্মেলনের ক্ষেত্রে আয়োজক দেশ বা সংস্থা সাধারণত একটি সংক্ষিপ্ত যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে, আর অংশগ্রহণকারী দেশ নিজস্ব জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।

প্রতিবেদনে বিজিবি প্রতিনিধিদল বিএসএফের কাছে “আত্মসমর্পণ” করেছে বা “আপোসকামী অবস্থান” নিয়েছে, এমন অভিযোগেরও কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বাহিনীটি। বিজিবির মতে, এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো যাচাইযোগ্য তথ্য, নথি বা প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। বরং পুশ-ইন ইস্যুসহ সীমান্ত সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে বিজিবি সাম্প্রতিক সময়ে দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছে।

বাংলাদেশের তথাকথিত “পজিশন পেপার” বৈঠকের আগে বিএসএফের হাতে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টিকেও প্রতিবেদনে অস্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে বিজিবি জানায়, “পজিশন পেপার” সম্মেলনের কোনো আনুষ্ঠানিক পরিভাষা নয়। মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকের আগে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচ্যসূচি, এজেন্ডা পয়েন্ট এবং প্রাসঙ্গিক নথি বিনিময় একটি নিয়মিত ও প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া। ফলে এটিকে “গোপন তথ্য ফাঁস” বা “নিরাপত্তা ব্যত্যয়” হিসেবে চিত্রিত করা বিভ্রান্তিকর।

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে বিজিবি মহাপরিচালকের সাক্ষাৎকে “গোপন বৈঠক” হিসেবে উল্লেখ করারও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাহিনীটি। বিজিবির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আয়োজক দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা সমপর্যায়ের কর্মকর্তার সঙ্গে অতিথি প্রতিনিধিদলের প্রধানের সৌজন্য সাক্ষাৎ দীর্ঘদিনের প্রচলিত কূটনৈতিক রীতি। এবারও বৈঠকটি পূর্বনির্ধারিত ও অনুমোদিত ছিল এবং সেখানে সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখিত কোনো চিঠি ওই বৈঠকে হস্তান্তর করা হয়নি বলেও দাবি করেছে বিজিবি।

এছাড়া, বিজিবি মহাপরিচালকের ভারতে পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণের প্রসঙ্গ তুলে ব্যক্তিগতভাবে তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে বাহিনীটি। তাদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের জন্য একটি স্বাভাবিক বিষয়। একজন কর্মকর্তার মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার দায়িত্ব পালন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকার ভিত্তিতে; প্রশিক্ষণ গ্রহণের দেশের ভিত্তিতে নয়।

বিজিবি বলেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন, মাদক ও মানবপাচার প্রতিরোধ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যক্রম পরিচালনায় বাহিনীটির নেতৃত্ব দৃঢ় ভূমিকা পালন করেছে। এ অবস্থায় শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রমাণহীন ব্যক্তিগত আক্রমণ বাহিনীর মনোবল ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বাহিনীটি মনে করে, সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে দায়িত্বশীল, তথ্যভিত্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মতামত ও বিশ্লেষণ অবশ্যই যাচাইকৃত তথ্য, প্রামাণ্য নথি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্যের ভিত্তিতে হওয়া উচিত বলে উল্লেখ করেছে বিজিবি।

প্রতিবাদের শেষে বিজিবি আশা প্রকাশ করে যে, বিষয়টির এই স্পষ্টীকরণ প্রকাশের মাধ্যমে পাঠকদের সামনে সঠিক তথ্য উপস্থাপনে গণমাধ্যম দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।

logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com