

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (সংশোধন) অধ্যাদেশসহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ৮টি অধ্যাদেশকে জাতীয় সংসদে বিল আকারে উত্থাপন ও পাস করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে অধ্যাদেশগুলো জাতীয় সংসদের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ আইনি স্বীকৃতি পেল।
আজ মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দশম দিন ছিল। এদিন সংসদে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সকালের অধিবেশন শুরুর পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা বিলগুলো পাসের জন্য উত্থাপন করেন। কোনো প্রকার দফাওয়ারি সংশোধন প্রস্তাব বা দীর্ঘ আলোচনা ছাড়াই বিলগুলো কণ্ঠভোটে পাস হয়।
সংসদীয় সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছে। এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করার জন্য বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে (১২ মার্চ) সরকারি ও বিরোধী দলীয় সদস্যদের নিয়ে ১৩ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু এবং ১৫টি সংশোধিত আকারে অনুমোদনের সুপারিশ করে। আগামী ৯ এপ্রিলের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এসব অধ্যাদেশ পাস করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মূলত সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো পাস না হলে সেগুলো কার্যকারিতা হারাবে। অবশিষ্ট ২০টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৪টি রহিত করা এবং ১৬টি আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল হিসেবে আনার সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি।
এদিন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী 'হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ বিল' পাসের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। এরপর আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান একে একে 'কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল', 'সিভিল কোর্টস (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল', 'ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল' এবং 'রেজিস্ট্রেশন (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল' পাসের প্রস্তাব করেন। বিলগুলো পৃথকভাবে কণ্ঠভোটে পাস হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তিনটি বিল সংসদে উত্থাপন করেন। বিলগুলো হলো— 'ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) বিল', 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল' এবং 'শেখ হাসিনা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল'। এর মধ্যে শেষের দুটি বিল পাস হয়। সবশেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন 'বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট (সংশোধন) বিল' পাসের প্রস্তাব করলে তাও কণ্ঠভোটে পাস হয়। মূলত প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম পরিবর্তনের লক্ষ্যে জারি করা অধ্যাদেশগুলোই বিল আকারে সংসদে পাস করা হয়েছে।
'শেখ হাসিনা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল'টি উত্থাপনের সময় এক হাস্যরসাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কিছুটা হেসে বলেন, 'খুব দুঃখের ব্যাপার, এতক্ষণ তো যা বললাম, এখন আবার শেখ হাসিনা বলতে হচ্ছে।' এ সময় সংসদে উপস্থিত সংসদ সদস্যদের অনেককে হাসতে দেখা যায়।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংক্রান্ত বিলটি পাসের প্রস্তাব দেওয়ার সময় আইনমন্ত্রী এর গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, 'এটি এমন একটি বিল, যার মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় গুমকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যারা বলছেন, সরকার গুম প্রতিরোধের আইন করতে চাইছে না, তাদের তিনি এ আইন ভালো করে দেখার পরামর্শ দেন।' তিনি আরও বলেন, 'বর্তমান সরকার গুমের বিচারে বদ্ধপরিকর, সেটার বহিঃপ্রকাশ এই আইনে এসেছে।'
বিলটি পাস হওয়ার পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এর বিরোধিতা করেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, 'আইনমন্ত্রী বিল পাসের প্রস্তাব করতে গিয়ে যা বলেছেন, তা অনাহূত। এটা না বললেই ভালো হতো। নির্দিষ্ট সময় যখন আসবে, তখন এ বিষয়ে তারা কথা বলবেন।'
জবাবে আইনমন্ত্রী পুনরায় জানান, সংসদের বাইরে অনেকে গুমের বিচার করার ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেছেন। সে কারণে এ বিল উপস্থাপনের আগে তিনি পরিষ্কার করেছেন যে গুমের বিচারে সরকার কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
উভয় পক্ষের বক্তব্যের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ আইনমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'বাইরে কতজন কত কথা বলে। আপনি সংসদের আলোচনার মধ্যে, সংসদ সদস্যদের মধ্যে বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখেন।' স্পিকার আরও যোগ করেন, 'আইনবিধি অনুযায়ী যেটা গৃহীত হবে, সেটা নিয়ে কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।' এরপর স্পিকার অন্যান্য বিল পাসের কার্যক্রম শুরু করেন।