

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রশাসন ও বিচার বিভাগে বড় ধরনের পরিবর্তন এলেও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বহাল থাকেন। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অন্তত দুই দফা তার অপসারণের দাবি উঠলেও শেষ পর্যন্ত তিনি বঙ্গভবনেই দায়িত্ব পালন করেন এবং সম্প্রতি নবনির্বাচিত সরকারপ্রধানকে শপথবাক্য পাঠ করান।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কমপক্ষে দুই দফায় রাষ্ট্রপতির অপসারণ কিংবা পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাও কিংবা বড় ধরনের চাপ তৈরি করা হলেও মো. সাহাবুদ্দিন থেকে গেছেন বঙ্গভবনেই। তিনিই গত ১২ই ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের পর ১৭ই ফেব্রুয়ারি নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে শপথ পড়িয়েছেন।
দৈনিক কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি নিজেই তার টিকে থাকার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, দুঃসময়ে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) পূর্ণ সমর্থন পেয়েছিলেন। তার ভাষায়, “আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।”
রাষ্ট্রপতি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকেও তাকে অপসারণের চেষ্টা হয়েছিল। তবে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। তিনি আরও দাবি করেন, সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকেও তাকে সমর্থন দেওয়া হয়েছিল।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের এসব বক্তব্যের বিষয়ে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার তৎকালীন প্রেস উইংয়ের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করা হলে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক সদস্য বলেছেন যে, এই বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করতে চান না।
বিএনপি কেন অন্তর্বর্তী সরকারের ওই সময়কালে রাষ্ট্রপতি পদে মো. সাহাবুদ্দিনের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল কিংবা কেন রাষ্ট্রপতি পদে তাকে বহাল রাখতে অনড় ছিল? এর আগে তখনকার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ওই বছরের ১৩ই ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন।
এখন প্রশ্ন হলো, বিএনপি কেন অন্তর্বর্তী সরকারের ওই সময়কালে রাষ্ট্রপতি পদে মো. সাহাবুদ্দিনের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল কিংবা কেন রাষ্ট্রপতি পদে তাকে বহাল রাখতে অনড় ছিল?
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের অপসারণের দাবি যখন উঠছিল, তখন বিএনপির সিনিয়র নেতারা রাষ্ট্রপতির অপসারণের বিরোধিতার কথা বলেছিলেন প্রকাশ্যেই। তখন তারা এর পক্ষে ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে’, ‘সাংবিধানিক সংকট হতে পারে’ কিংবা ‘নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হতে পারে’ – এমন কিছু যেন না হয় সেই যুক্তি তুলে ধরেছিলেন।
কিন্তু এখন আর বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি নন দলটি সিনিয়র নেতারা। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, এ নিয়ে কী আলোচনা হয়েছে সেটি তার জানা নেই।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা স্থায়ী কমিটির আরেকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে তাদের অবস্থান ছিল এমন যে- যাতে করে এটিকে কেন্দ্র করে দেশের স্থিতিশীলতায় কোনো সংকট না হয়, যা সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও বিপন্ন করে তুলতে পারতো।
তার মতে, বিএনপি তখন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখা ও দ্রুত নির্বাচন আদায়ের নীতি নিয়েছিল। তারা মনে করেছেন শেখ হাসিনার পতনের পর যখন সব সংবিধান অনুসরণ করেই হচ্ছিল, তখন অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্রপতিকে সরানো হলে সেটি পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাতো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, শেখ হাসিনার পতনের পর শুরু থেকেই বিএনপি নির্বাচন চেয়ে আসছিল এবং নির্বাচন ঝুঁকিতে পড়বে এমন কিছুতেই দলটি সায় দিতে রাজি ছিলো না।
“রাষ্ট্রপতিকে কেন্দ্র করে নির্বাচন অনিশ্চিত হোক সেটি তারা চায়নি। কারণ তারা জানতো যে যত দ্রুত নির্বাচন হবে তত তারা ভালো করবে। এজন্যই রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের বিপক্ষে তারা অবস্থান নিয়েছিল বলে আমার মনে হয়,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
সেখান থেকে বেরিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, দেশে যাতে নতুন করে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি না হয়, সে জন্য তাঁরা অন্তর্বর্তী সরকারকে খেয়াল রাখতে বলেছেন।
ওইদিনই বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে এবং এতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিলম্বিত হবে। তাই এই মুহূর্তে রাষ্ট্রপতির অপসারণ চায় না বিএনপি।
তিনি তখন আরও বলেছিলেন,”এই পদটা একটা সাংবিধানিক পদ, একটা প্রতিষ্ঠান। সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। এই পদে হঠাৎ করে পদত্যাগের মাধ্যমে শূন্যতা সৃষ্টি হলে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে। রাষ্ট্রীয় সংকটের সৃষ্টি হবে।”
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই আন্দোলনকারীদের দিক থেকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি উঠতে থাকে। যদিও তার কাছেই শপথ নিয়েছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
ড. ইউনূস শপথ নেওয়ার পর আর কখনো বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাৎ করেননি। এমনকি সরকার প্রধানের বিদেশ সফর থেকে এসে রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাৎ করে সফরের বিস্তারিত জানানো কিংবা কোনো চুক্তি হলে তা রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করার যে রাষ্ট্রাচারের চর্চা ছিল সেটিও তিনি মানেননি।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের দুই মাসেরও বেশি সময় পর ১৯ অক্টোবর ঢাকার দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় রাষ্ট্রপতির একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ হয়। এতে তিনি দাবি করেছিলেন ‘তিনি শুনেছেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন কিন্তু তাঁর কাছে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই”।
এই ঘটনায় তীব্র ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে অন্তর্বর্তী সরকার ছাড়াও শেখ হাসিনা সরকার পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা বিরোধী বিভিন্ন সংগঠন, যেগুলো শেখ হাসিনার পতনের পর গড়ে ওঠেছিল।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মিথ্যাচার করেছেন বলে তখন মন্তব্য করেছিলেন তখনকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ ও ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধের দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গণজমায়েত কর্মসূচি শুরু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ওই দিন বঙ্গভবনের সামনে অবস্থান নেয় একদল বিক্ষোভকারী।
ইনকিলাব মঞ্চ, রক্তিম জুলাই’২৪, ৩৬ জুলাই পরিষদ, জিয়াউর রহমান সমাজকল্যাণ পরিষদসহ বিভিন্ন নামে আলাদা আলাদা বিক্ষোভ শুরু হয় বঙ্গভবনের সামনে। এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবনের সামনের রাস্তা অবরোধের পর রাতে ব্যারিকেড ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে এসব সংগঠনের কর্মীরা। পরে সেই রাতে পুলিশ ও সেনা সদস্যদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
তখনকার তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ওইদিন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকার রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।