

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে প্রধান উপদেষ্টা করে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশের প্রায় দুই বছর ধরে দায়িত্বে আছে। এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল—রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা, প্রাথমিক সংস্কার করা এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কতটুকু সফলতা এসেছে এবং কোথায় ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে—এটা নিয়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সমাজসচেতন মহলে নানা মত ও বিশ্লেষণ তৈরি হয়েছে।
ইউনুস-অধিকৃত অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে দেশ দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক শূন্যতা থেকে বেরিয়ে এসে আবার রাষ্ট্র পরিচালনার একটি ক্রম প্রতিষ্ঠা করেছে। এই সরকার সুপ্রিম কোর্টের আইন অনুযায়ী বৈধভাবে গঠিত হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করেছে।
ইউনুস নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশে বিভিন্ন পেশাদার ও বিশেষজ্ঞ মূলক ১৫টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে—যাতে নির্বাচন, বিচার ব্যবস্থা, পুলিশ, দুর্নীতি প্রতিরোধ, প্রশাসন ও গণমাধ্যম ইত্যাদি বিষয়ে সুপারিশ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে কিছু সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদদের সহায়তায় ইউএন (IMF/World Bank)-সমর্থিত উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের বড় সংস্কার করা হয়েছে—যাতে গুরুতর সমস্যায় থাকা ব্যাংকগুলোর বোর্ড পুনর্গঠন, মার্জার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়েছে, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি কমে আসছে ও রিজার্ভে বৃদ্ধিও লক্ষ্য করা গেছে।
ইতোমধ্যে সাধারণ নির্বাচন ও জাতীয় গণভোটের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পুনরুদ্ধার ও গণতান্ত্রিক মানিয়ে নেওয়ার একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং ভোট ও গণভোটকে কেন্দ্র করে জনমতেও নতুন উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়।
ইউনুস পরিচালিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি রাজনৈতিক দলের সমর্থন ও সমালোচনা একত্রিত হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী পক্ষ দাবি করেছে যে সরকার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয় এবং নির্বাচনের সময় প্রশাসনিক একাংশকে নিয়ন্ত্রণ করার দাবি তুলেছে—বিচ্ছিন্ন উপদেষ্টাদের উপস্থিতিও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে সরকারের সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা গেছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন স্কেল, সামাজিক ন্যায্যতা ও প্রাথমিক মানবাধিকার ইস্যুতে জনঅসন্তোষ বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ পায়, এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত তীব্র হয়েছে বলে প্রতিবেদন এসেছে।
বিশ্লেষকরা এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলেছেন যে ইউনুস সরকারের নেতৃত্ব কখনোই পরিচ্ছন্নভাবে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারেনি। পদত্যাগের সংকট, রাজনৈতিক আস্থার অভাব এবং কোন সুদৃঢ় সামাজিক নীতি ঘোষণা না করতে পারার কারণে সরকার অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে—যা অনেক বিশ্লেষকে দুর্বল নেতৃত্বের পরিচায়ক বলে মনে হচ্ছে।
সরকারের কিছু নীতিকে অনেকে সঠিকভাবে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের জন্য দাঁড়ায়নি বলে সমালোচনা করেছেন। যেমন শিক্ষা, গবেষণা, মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু অধিকার ইস্যুতে শক্তিশালী পদক্ষেপ না নেওয়া হয়েছে এমন দৃষ্টিভঙ্গিও প্রচলিত আছে।
অধ্যাপক ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন প্রস্তুতি, ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, এবং রাজনীতির পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি করেছে—বিশেষত যখন দেশ দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটে ছিল এবং সংবিধানভঙ্গের পর সরকারই কার্যকরভাবে নেই। তবে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, জনমতের আস্থা, নেতৃত্বের দৃঢ়তা এবং সামাজিক ইস্যুগুলিতে স্পষ্ট অগ্রগতি অনালোচিত এবং বিরোধীদের কাছে ব্যর্থতার নমুনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবায়নের মধ্যে ফাঁক থাকা এই সরকারের সফলতা ও ব্যর্থতা—দুটোই স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে, এবং এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন প্রাপ্ত ফলাফলগুলোর ওপর নির্ভর করবে দেশ নির্বাচনের পরে কোন সরকার ক্ষমতায় আসে ও কোন পথে দেশ এগোবে।
সফল দিক: নির্বাচনের প্রস্তুতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং সংস্কার, রাজনৈতিক গঠন
ব্যর্থ দিক: রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক, জনমত বিভাজন, নেতৃত্বের দায়িত্বশীলতা ইস্যু, সামাজিক নীতিতে স্পষ্ট অভাব