

একসময় এই বাক্যটি ছিল ক্ষুধার বিরুদ্ধে মানুষের প্রতীকী প্রতিবাদ। কিন্তু আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতায় প্রশ্নটা আর শুধু রূপক নয়, এটি ধীরে ধীরে এক নির্মম বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। সাম্প্রতিক, ‘Global Report on Food Crises- 2026’ সেই অস্বস্তিকর সত্যটিকেই সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
২০২৫ সালে বিশ্বের ৪৭টি দেশ ও অঞ্চলে প্রায় ২৬.৬ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি বিশ্ব ব্যবস্থার ভঙ্গুরতার প্রতিচ্ছবি। এক দশকে এই হার প্রায় দ্বিগুণ হওয়া দেখায়, সমস্যাটি সাময়িক নয়, বরং গভীরে নিহিত।
খাদ্য সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর অসম বণ্টন। বিশ্বের মোট ক্ষুধার্ত মানুষের দুই-তৃতীয়াংশ মাত্র ১০টি দেশে কেন্দ্রীভূত, যার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। এই বাস্তবতা বুঝতে হলে শুধু কৃষি উৎপাদন বা জনসংখ্যার দিকে তাকালে হবে না; এর পেছনে রয়েছে সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ঘাটতি।
সংঘাত এখন ক্ষুধার সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। গাজা যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে খাদ্য কেবল সংকুচিত হয় না, বরং পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে। কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে যায়, বাজার অকার্যকর হয়, আর ত্রাণ পৌঁছানো হয়ে ওঠে কঠিন। ফলে ক্ষুধা সেখানে কেবল একটি উপসর্গ নয়, এটি হয়ে ওঠে একটি কৌশলগত সংকট।
তবে যুদ্ধই একমাত্র কারণ নয়। বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে। জ্বালানির দাম বাড়লে সারের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, আর সারের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন কমে। এই চেইন রিঅ্যাকশন শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে মানুষের থালায়।
জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলছে। খরা, বন্যা, লবণাক্ততা, এসব শুধু ফসল নষ্ট করছে না, বরং কৃষির পূর্বানুমানযোগ্যতাকেই ধ্বংস করছে। ফলে কৃষক যেমন অনিশ্চয়তায় পড়ছে, তেমনি পুরো খাদ্য ব্যবস্থাই ঝুঁকির মধ্যে চলে যাচ্ছে।
এই সংকটের সবচেয়ে নির্মম শিকার শিশুদের একটি বড় অংশ। ২০২৫ সালে প্রায় ৩ কোটি ৫৫ লাখ শিশু অপুষ্টিতে ভুগেছে, যার মধ্যে এক কোটির মতো শিশুর জীবন সরাসরি ঝুঁকিতে। ইউনিসেফ ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে- এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে একটি “হারানো প্রজন্ম” তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব অর্থনীতি ও সমাজে দীর্ঘমেয়াদি হবে।
একই বছরে গাজা ও সুদানে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইতিহাসে এই প্রথম একসঙ্গে দুই স্থানে দুর্ভিক্ষ। এটি প্রমাণ করে যে, খাদ্য সংকট এখন বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়; এটি একটি সমান্তরাল বৈশ্বিক সংকট হিসেবে গড়ে উঠছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নীরব বিপদ, আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি। গত এক দশকের মধ্যে খাদ্য সহায়তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে যেসব দেশ সম্পূর্ণভাবে বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, তারা আরও বড় ঝুঁকিতে পড়ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এই বৈশ্বিক সংকটের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিচ্ছবি। একদিকে জলবায়ু ঝুঁকি, অন্যদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থীর চাপ, সঙ্গে আমদানিনির্ভর খাদ্য ও জ্বালানি, সব মিলিয়ে একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। যদিও কিছু সূচকে উন্নতি দেখা গেছে, তবুও সামগ্রিকভাবে ঝুঁকি এখনও উঁচু।
-প্রধান চাপগুলো সংক্ষেপে:
- জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ঘনঘটা
- বৈশ্বিক বাজারের ওপর নির্ভরতা
- কৃষি উৎপাদনে ব্যয় বৃদ্ধি
- জনসংখ্যার ঘনত্ব ও সম্পদের চাপ
এবিষয়ে, খাদ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন, সরবরাহ, বন্টন ও বিপণন বিভাগের পরিচালক(ভারপ্রাপ্ত), মোঃ জহিরুল ইসলাম খান এবং উপপরিচালক, মোঃ আফিফ-আল-মাহমুদ ভূঁঞা, এর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
খাদ্য বিতরণ কর্মসূচিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত নাম, ‘মাস্তুল ফাউন্ডেশন’। ২০১২ সাল থেকে সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় শিশুদের জন্য কাজ করছে তারা।
মাঠপর্যায়ে নিয়মিত কাজ থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অভিজ্ঞতা জানতে চাওয়া হলে, মাস্তুল ফাউন্ডেশনের, হেড অফ পাবলিক রিলেশন, সৈয়দা প্রিয়াঙ্কা জানান-
অসহায় মানুষ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ছাড়াও আমাদের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, সেলসম্যান, দারোয়ানের মতো নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষদের সেবা গ্রহণ বাড়ছে। তুলনামূলক কম উপার্জনের এসব মানুষ কোথাও হাত ও পাততে পারেন না। আমরা তাদের খাবার খরচটা বাঁচাতে পেরে সন্তুষ্ট।
মাঠের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বলতে পারি, খাদ্য সংকটের সবচেয়ে নীরব শিকার শিশুরা। আমরা দেখেছি, নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার বঞ্চিত শিশুর সংখ্যা অনেক বেশি। বিশেষ করে বস্তি এলাকা ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর শিশুরা শুধু পেট ভরানোর জন্য খাবার খায়, কিন্তু সেই খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি থাকে না। তাই আমরা শুধু খাবার বিতরণ নয়, দুপুরে পুষ্টিকর খাবার পৌঁছে দিচ্ছি।
আন্তর্জাতিক সহায়তা হ্রাসের প্রভাবের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা দেশ এবং আন্তর্জাতিক ফান্ড নিয়ে কাজ করছি। আগের তুলনায় আন্তর্জাতিক ফান্ড কিছুটা কমছে। তবে, আমরা দেশের মানুষের সহায়তা ও ভালোবাসায় আমাদের কার্যক্রম চলমান রাখছি আলহামদুলিল্লাহ।
মাস্তুল ফাউন্ডেশন সবসময় চেষ্টা করে স্বচ্ছতা বজায় রেখে দাতাদের আস্থা ধরে রাখতে, যাতে এই সহায়তার ধারা অব্যাহত থাকে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৬ সালেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা কম। বরং বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে António Guterres এই পরিস্থিতিকে একটি “গ্লোবাল ওয়েক-আপ কল” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।সমাধানের পথ সহজ নয়, তবে পরিষ্কার। ত্রাণনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে, জলবায়ু সহনশীল কৃষিতে বিনিয়োগ করতে হবে, এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনকে আরও স্থিতিশীল করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- এই সংকটকে শুধুমাত্র মানবিক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে নিয়ে আসা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকে যায়-
“ভাত দে, নাহলে মানচিত্র খাবো”- এটি কি আবার কেবল স্লোগান থাকবে, নাকি বিশ্ববাসীর বাস্তব অভিজ্ঞতায় পরিণত হবে?
উত্তর নির্ভর করছে এখনকার সিদ্ধান্তের ওপর- যেখানে খাদ্য আর শুধু পুষ্টির বিষয় নয়, এটি টিকে থাকার সংগ্রাম।