আইনে নেই দাসত্ব, বাস্তবতা ভিন্ন

আইনে নেই দাসত্ব, বাস্তবতা ভিন্ন

আইনে নেই দাসত্ব, বাস্তবতা ভিন্ন

আন্তর্জাতিক দাসত্ব বিলোপ দিবস আজ
প্রকাশিত

দাস- দাসপ্রথা, বহু প্রাচীন এই ব্যবস্থা এখন আর নেই বলেই জানে বিশ্ব। তবে কার্ল মার্ক্স এর মতে, মালিক এবং শ্রমিক শ্রেণির অন্তঃদ্বন্দ একটি চলমান প্রক্রিয়া। আধুনিকায়ন বা শিল্পায়ন এর সাথে সাথে তা আরো বর্ধনশীল।

সুতরাং, ১৯৪৯ সালে United Nations General Assembly তে, ২ রা ডিসেম্বর কে আন্তর্জাতিক দাসত্ব বিলোপ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা বা রাজনৈতিক দলগুলো এখনও দাসপ্রথার অস্তিত্ব অনুভব করেন।

আজ, দাসত্ব বিলোপ দিবসের ৭৬ বছরে দাঁড়িয়ে  আমরা অভিমত জানতে চাই শ্রমিকশ্রেণীর। তারা কি নিজেদেরকে একজন কর্মজীবী হিসেবে ভাবেন নাকি দাসত্বের কষাঘাতে এখনও জর্জরিত হয়েই জীবনযাপন করেন? পাশাপাশি, অধিকার আদায়ে সচেষ্ট রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের মতামতও জানবো আমরা।

আন্তর্জাতিক দাসত্ব প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে স্বাধীন মানব জাতির প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ দপ্তর সম্পাদক মোহাম্মাদ আলী ত্বোহা।

তিনি বলেন  মানব পাচার, যৌন দাস, জবরদস্তিমূলক শিশুশ্রম, বলপ্রয়োগে বিয়ে, যুদ্ধে শিশুদের ব্যবহার বন্ধে সচেতনতা বাড়ানো ইত্যাদি উদ্দেশ্য নিয়ে দাসত্ব প্রথা বিলুপ্ত করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে দাসত্ব প্রথা বাতিল হলেও, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দাসত্বের স্বীকার হোন পুরো জাতি, একক শাসন আধিপত্য ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিকতার কারণে এই অবস্থার শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে। দেশ এবং সারাবিশ্বেই  কারো যেন দাসত্ব বরণ করতে না হয়, বিশ্বের সকল মানুষ মাথা উচু করে দাঁড়াক।

ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের বেশিরভাগই মধ্যবয়স্ক। যারা প্রায় ৮-১০ বছর ধরে এই কর্মে জড়িত। কর্মপরিবেশ তো বটেই, পাশাপাশি তারা মজুরি পাওয়া নিয়ে ও অসুবিধায় ভোগেন। এছাড়া, তাদের অতিরিক্ত কর্ম এবং কখোনো কখোনো অপ্রত্যাশিত কর্ম (যা তাদের করার কথা নয়) ও করতে হয়।

শ্রমিক অধিকার এবং সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে তাদের বেশিরভাগই অজ্ঞ। এ সম্পর্কে তারা সচেতন নয় এবং তারা প্রায় কেউই কর্মে যোগদান থেকে এখন অবধি এমন কোনো অধিকার বা সুবিধার কথাই শোনেননি।

কর্মক্ষেত্রের প্রধান সমস্যা হিসেবে তারা সকলেই, মালিকশ্রেণীর বাজে ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন। এছাড়া, ছোটখাটো বা ব্যক্তি উদ্যোগে চলা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকরা একদমই বিশ্রামের সময় পান না বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি, সকলেই জানান যে, সদিচ্ছা থাকলেও প্রাপ্য মজুরিতে তারা সন্তানের লেখাপড়া চালাতে হিমশিম খান।

সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি, নয়াদিল্লি’র সমাজবিজ্ঞান বিভাগের পোস্টগ্রাজুুয়েট শিক্ষার্থী রিহাদ মাহমুদ বলেন,

যদিও আন্তর্জাতিক দাসপ্রথা বিলোপ দিবস দাসপ্রথাকে নিষিদ্ধের কথা বলে, তবুও ইতিহাসের দিকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, আইনি বিষয় না থেকে এটি ছিলো মূলত উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে মানুষের নির্ভরশীলতার ক্ষমতার সম্পর্ক, যেখানে একটি নির্দিষ্ট শ্রেনির মানুষ অন্য মানুষদের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। সুতরাং আমরা ইতিহাসের সেই বৈধ দাসপ্রথা বিলুপ্তির কথা বললে বা ভাবলেও, বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজের কাঠামো শ্রমকে চুক্তি, ঋণ, মজুরি, সীমান্ত, বাজার, অভিবাসন ইত্যাদির মাধ্যমে নতুনরুপে উপস্থিত করেছে।

অর্থাৎ, আইনগত ভাবে এখন দাসপ্রথা না থাকলেও এটার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তির যে যুক্তি সেটি এখনও প্রতিষ্ঠিত আছে।

বর্তমান কৃষিবীজের মালিকানা কৃষকদের হাত থেকে পুঁজিবাদের হাতে চলে যাওয়া, বা অতিরিক্ত নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে গ্রাম ছেড়ে শহরের শিল্পকারখানায় যাবার মধ্য দিয়ে নতুনরুপে দাসপ্রথার উৎপত্তির কথা বাদ দিলেও, বাংলাদেশের মানুষকে দুটো বিষয় নিয়ে খুব গর্ব করতে দেখা যায়। তা হলো, গার্মেন্টস সেক্টর ও পশ্চিমা দেশে গিয়ে উন্নত জীবন-যাপন করা।

গার্মেন্টস সেক্টর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেমিটেন্স আনছে, এবং বিশ্বের দরবারে নিজের নাম উপস্থাপন করছে ভেবে সবাই যেমনটা গর্ব করে, এই জিনিসটা ততটাই লজ্জার, এবং দাসপ্রথার যে একটা অর্থনৈতিক-ভিত্তির বাইরে সামাজিক ভিত্তিও রয়েছে, এটার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়। বাংলাদেশ বড়দাগে পোশাক রপ্তানি করছে, যেখানে অধিকাংশ শ্রমিকই নারী, এখানে বাংলাদেশে সবচেয়ে সস্তায় শ্রমকে কেনা যায়, এটাকে না ধরতে পারলে আমরা আধুনিক দাসপ্রথাকে বুঝতে পারবোনা।

আবার যারা পশ্চিমা দেশে যেয়ে “উন্নত জীবন-যাপনের” কথা ভাবছে, তারা আসলে সেই উন্নত বা এগিয়ে যাওয়া দেশেই তার শ্রমকে নতুনরুপে বিক্রি করে নতুন ধরণের দাসপ্রথারই মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিকে জোরদার করে বলে আমি মনে করি।

সুতরাং বর্তমানে আন্তর্জাতিক দাসপ্রথা বিলোপ দিবস নিয়ে গর্বিত হওয়ার চেয়ে, বর্তমান সমাজে দাসপ্রথার অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ভিত্তির বাইরে গিয়ে, মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমরা কিভাবে দাসপ্রথাকে লালন করছি, সেটা নিয়ে আলাপ ও চিন্তা করাটা জরুরি।

logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com