

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন দল গঠনের ঘটনা নতুন নয়।
প্রায় প্রতি দশকেই একাধিক নতুন বা ছোট রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। কেউ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়, কেউ পুরোনো রাজনীতির বিকল্প হওয়ার দাবি তোলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই দলগুলো জনআলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে যায়।
প্রশ্ন তাই প্রাসঙ্গিক- নতুন বা ছোট রাজনৈতিক দলগুলো কেন দৃশ্যমান প্রভাব রাখতে পারে না? এর উত্তর কোনো একক দুর্বলতায় নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো, ক্ষমতার প্রকৃতি ও সামাজিক বাস্তবতার সম্মিলিত ফল।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা আদতে সমান নয়। বড় দলগুলো শুধু ভোটে নয়, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিসরের বড় অংশে প্রভাবশালী। প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, ব্যবসা, এমনকি সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত।
এই কাঠামোর ভেতরে নতুন দল মাঠে নামে-
সীমিত সম্পদ নিয়ে
দুর্বল সংগঠন নিয়ে
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ছাড়াই
ফলে তাদের লড়াই শুরু থেকেই অসম।
নির্বাচনী রাজনীতিতে দৃশ্যমানতা আসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ফলাফলের মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায়-
আসনভিত্তিক (first-past-the-post) পদ্ধতি
জোটনির্ভর রাজনীতি
নির্বাচনকেন্দ্রিক আস্থার সংকট
এই তিনটি মিলিয়ে ছোট দলগুলোর ভোট অনুবাদ হয়ে আসনে রূপ নিতে পারে না। ফলে তারা জাতীয় আলোচনায় টিকে থাকার রাজনৈতিক পুঁজি হারায়।
রাজনীতি এখন ব্যয়বহুল। প্রচারণা, মাঠপর্যায়ের কর্মী, আইনি লড়াই, সবকিছুর জন্য অর্থ প্রয়োজন। বড় দলগুলোর রয়েছে-
স্থায়ী অর্থায়নের উৎস
ব্যবসায়িক ও প্রবাসী নেটওয়ার্ক
রাষ্ট্রীয় সুবিধার ঘনিষ্ঠতা
ছোট দলগুলোর কাছে রাজনীতি আদর্শ হলেও টিকে থাকার উপকরণ থাকে না।
বাংলাদেশের ভোটার আচরণ ব্যক্তি ও পরিচয়নির্ভর। মানুষ নতুন আদর্শে কম, পরিচিত ক্ষমতায় বেশি আস্থা রাখে। ফলে নতুন দলকে দেখা হয়-
পরীক্ষিত নয়
ক্ষমতায় যাওয়ার যোগ্য নয়
ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প হিসেবে
এই মানসিকতা ছোট দলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা সীমিত করে।
রাজনৈতিক প্রভাবের একটি বড় অংশ আসে মিডিয়া দৃশ্যমানতা থেকে। কিন্তু মিডিয়া কাভারেজও ক্ষমতাকেন্দ্রিক। বড় দল মানেই সংবাদ, ছোট দল মানেই প্রান্তিক।
সোশ্যাল মিডিয়া সাময়িক আলোচনার সুযোগ দিলেও তা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করতে পারে না।
বাংলাদেশে কার্যকর বিরোধী রাজনীতির পরিসর সীমিত। এই বাস্তবতায় ছোট দলগুলো-
সংসদে প্রবেশ করতে পারে না
রাজপথে টিকতে পারে না
আলোচনার টেবিলে জায়গা পায় না
ফলে তারা দ্রুত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।
নতুন দলগুলো সাধারণত আদর্শিকভাবে উচ্চাভিলাষী, কিন্তু কৌশলগতভাবে দুর্বল। তারা সংস্কারের কথা বলে, কিন্তু-
ধাপে ধাপে ক্ষমতা অর্জনের রোডম্যাপ থাকে না
স্থানীয় রাজনীতিতে কাজ করার ধৈর্য থাকে না
জোট বা সমঝোতায় অনীহা দেখা যায়
রাজনীতিতে আদর্শ প্রয়োজন, কিন্তু কৌশল ছাড়া আদর্শ টেকে না।
ছোট দলগুলোর প্রধান সমর্থন আসে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত থেকে। কিন্তু এই শ্রেণি রাজনৈতিকভাবে-
সংখ্যায় সীমিত
সংগঠনে দুর্বল
ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক
ফলে সমর্থন থাকে বুদ্ধিবৃত্তিক, কিন্তু মাঠে অনুপস্থিত।
ছোট দলগুলো প্রায়ই রাষ্ট্রীয় প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। নিবন্ধন জটিলতা, সমাবেশের অনুমতি, আইনি চাপ। বড় দল এসব সামাল দেওয়ার সক্ষমতা রাখে; ছোট দল দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
তাহলে কি ছোট দলগুলোর ভবিষ্যৎ নেই?
পুরোপুরি নয়। কিন্তু দৃশ্যমান প্রভাব রাখতে হলে নতুন দলগুলোকে-
এক বা দুইটি ইস্যুতে গভীর কাজ করতে হবে
স্থানীয় সরকারে শক্ত ভিত্তি গড়তে হবে
আদর্শের পাশাপাশি বাস্তব কৌশল নিতে হবে
দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে
বড় দল হওয়ার আগে প্রভাবশালী হওয়াই লক্ষ্য হওয়া উচিত।
বাংলাদেশে নতুন বা ছোট রাজনৈতিক দলগুলো দৃশ্যমান প্রভাব রাখতে পারে না, কারণ রাজনীতির মাঠটি কাঠামোগতভাবে অসম, সংস্কৃতিগতভাবে রক্ষণশীল এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক। এটি নতুন দলের ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি একটি ব্যবস্থাগত সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।
তবুও ইতিহাস বলে, বড় পরিবর্তন অনেক সময় ছোট কণ্ঠ থেকেই শুরু হয়।
প্রশ্ন হলো- নতুন দলগুলো কি শুধু বিকল্প হওয়ার দাবি করবে, নাকি ধৈর্য, কৌশল ও বাস্তববাদ দিয়ে সেই বিকল্পকে ধীরে ধীরে নির্মাণ করবে?