ক্ষমতা টিকে রাখার রাজনীতি: রাষ্ট্রীয় কল্যাণ নাকি জনপ্রিয়তা

বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় বৈধতা, নিয়ন্ত্রণ ও জনসমর্থনের দ্বন্দ্ব
ক্ষমতা টিকে রাখার রাজনীতি: রাষ্ট্রীয় কল্যাণ নাকি জনপ্রিয়তা
প্রকাশিত

গণতন্ত্রের মৌলিক সূত্র হলো, ক্ষমতার উৎস জনগণ। কিন্তু বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সূত্র ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। ক্ষমতা টিকে রাখার রাজনীতি আজ আর কেবল জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক শক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হয়ে উঠছে ক্ষমতার প্রধান ভরকেন্দ্র।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে- রাষ্ট্র কি ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তার বিকল্প হয়ে উঠছে?

জনপ্রিয়তা বনাম ক্ষমতার বাস্তব ভিত্তি

জনপ্রিয়তা রাজনীতিতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ, তবে তার ভূমিকা বদলেছে। একসময় গণসমাবেশ, ভোটের হার ও জনসমর্থন ছিল ক্ষমতার মূল সূচক। এখন অনেক ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক বয়ানের অংশ, আর বাস্তব ক্ষমতা নির্ভর করছে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারিক প্রক্রিয়া ও দলীয় নিয়ন্ত্রণের ওপর।

এই পরিবর্তন ক্ষমতার বৈধতার প্রশ্নকে জটিল করেছে। জনপ্রিয়তা যেখানে অনিশ্চিত ও পরিবর্তনশীল, সেখানে রাষ্ট্রীয় কাঠামো অপেক্ষাকৃত স্থায়ী, এই উপলব্ধিই ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশলে প্রতিফলিত হচ্ছে।

রাষ্ট্রযন্ত্রের কেন্দ্রীয় ভূমিকা

ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা বাংলাদেশে দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। প্রশাসনের আনুগত্য, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্রিয়তা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা রাজনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।

নির্বাচনী সময় ছাড়া অন্য সময়েও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কার্যকর রাখতে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে- এমন অভিযোগ নতুন নয়। এতে ক্ষমতার উৎস জনগণ থেকে সরে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের দিকে ঝুঁকছে।

জনপ্রিয়তার সংকট ও নিয়ন্ত্রিত অংশগ্রহণ

জনপ্রিয়তা সংকটে পড়লে একটি সরকার সাধারণত দুই পথে হাঁটে, আস্থার পুনর্গঠন বা নিয়ন্ত্রণের বিস্তার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অনেক সময় দ্বিতীয় পথটি বেশি দৃশ্যমান। রাজনৈতিক সমাবেশে বিধিনিষেধ, সমালোচনামূলক কণ্ঠে আইনগত চাপ, কিংবা নির্বাচনী প্রতিযোগিতার সংকোচন- সবই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কৌশলের অংশ।

এতে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থাকে, কিন্তু তা নিয়ন্ত্রিত; গণতন্ত্র থাকে, কিন্তু তা সীমিত।

উন্নয়ন বয়ান ও জনপ্রিয়তার বিকল্প

ক্ষমতা ধরে রাখার রাজনীতিতে ‘উন্নয়ন’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বয়ান। অবকাঠামো, প্রবৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় প্রকল্পকে জনপ্রিয়তার বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যুক্তি হলো- উন্নয়নই বৈধতার প্রমাণ।

কিন্তু উন্নয়ন যদি জবাবদিহি ও অংশগ্রহণ ছাড়াই হয়, তবে তা জনপ্রিয়তার স্থায়ী বিকল্প হতে পারে না। উন্নয়ন নাগরিক অধিকারকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না- এটি ইতিহাসে বারবার প্রমাণিত।

বিরোধী রাজনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্য

ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় বিরোধী শক্তি। বিরোধী রাজনীতি দুর্বল হলে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়। সংসদীয় জবাবদিহি, নীতি বিতর্ক ও বিকল্প চিন্তার জায়গা সংকুচিত হয়।

এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতা স্থিতিশীল দেখালেও তা হয় নাজুক, কারণ তা জনগণের সক্রিয় সম্মতির ওপর দাঁড়ানো নয়।

জনপ্রিয়তা কি অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে?

না। জনপ্রিয়তা অপ্রয়োজনীয় হয়নি, বরং তা ব্যবস্থাপনার বিষয় হয়ে উঠেছে। জনসমর্থন এখন নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া, বয়ান ও রাষ্ট্রীয় সাফল্যের গল্পের মাধ্যমে নির্মিত হয়। কিন্তু এই নির্মিত জনপ্রিয়তা প্রকৃত জনপ্রিয়তার বিকল্প নয়; এটি কেবল সময় কিনে দেয়।

দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি

রাষ্ট্রনির্ভর ক্ষমতা জনপ্রিয়তার চেয়ে বেশি স্থায়ী মনে হলেও এর ঝুঁকি বড়-

  • আকস্মিক জনঅসন্তোষের বিস্ফোরণ

  • প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসের ক্ষয়

  • প্রশাসনের অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ

  • রাষ্ট্র ও সরকারের পার্থক্য মুছে যাওয়া

  • এই ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে।

উত্তরণের পথ

ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার রাজনীতি থেকে ক্ষমতা বৈধ করার রাজনীতিতে যেতে হবে। এর জন্য-

  • জনপ্রিয়তাকে ভয় না পেয়ে গ্রহণ করা

  • প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা

  • রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরপেক্ষতা পুনর্গঠন

  • বিরোধী রাজনীতিকে কার্যকর হওয়ার সুযোগ দেওয়া

জনসমর্থন কোনো হুমকি নয়; এটি টেকসই ক্ষমতার একমাত্র ভিত্তি।

রাষ্ট্র দিয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব, কিন্তু জনপ্রিয়তা ছাড়া তা নিরাপদ নয়। জনপ্রিয়তা ছাড়া ক্ষমতা শক্ত দেখালেও ভেতরে ভেতরে ফাঁপা হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই বোধের ওপর- রাষ্ট্র ক্ষমতার রক্ষক হবে, না জনপ্রিয়তার বিকল্প?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ক্ষমতার স্থায়িত্ব নয়, বরং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com