

রাষ্ট্রের ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে একটি মৌলিক নীতির ওপর, আইনের শাসন। যেখানে আইন ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে, শাসক নয় আইন সর্বোচ্চ থাকে, আর নাগরিকের অধিকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয় না। কিন্তু যখন আইন নিজেই শাসনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তৈরি হয় এক ভিন্ন বাস্তবতা, যাকে বলা যায় শাসনের আইন। বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করছে, বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটছে?
এই প্রশ্নের উত্তর কেবল আদালত বা সংবিধানের ধারায় নয়; এর উত্তর লুকিয়ে আছে প্রশাসনিক আচরণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক অভিজ্ঞতার ভেতরে।
আইনের শাসনের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো সুপরিচিত-
আইন সবার জন্য সমান
শাসক নিজেও আইনের ঊর্ধ্বে নন
স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা
নির্বাহী ক্ষমতার ওপর আইনি সীমাবদ্ধতা
নাগরিক অধিকার সুরক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক গ্যারান্টি
এই কাঠামোতে আইন ক্ষমতার রাশ টানে; ক্ষমতা আইনকে নিজের মতো বাঁকাতে পারে না।
শাসনের আইনে চিত্রটি উল্টো। এখানে-
আইন প্রয়োগ হয় বেছে বেছে
আইনের ব্যাখ্যা নির্ভর করে রাজনৈতিক প্রয়োজনের ওপর
প্রশাসন হয়ে ওঠে শাসকের সম্প্রসারিত হাত
ন্যায়বিচার বিলম্বিত বা নির্বাচিত হয়
আইন তখন ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যম নয়; বরং শাসন টিকিয়ে রাখার কৌশল।
বাংলাদেশের সংবিধান, আদালত ও আইনগত কাঠামো কাগজে-কলমে আইনের শাসনের সব শর্ত পূরণ করে। কিন্তু বাস্তবে সমস্যাটি কাঠামোর নয়, কার্যকারিতার।
একই আইন ভিন্ন মানুষের জন্য ভিন্নভাবে প্রয়োগ হওয়া, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মামলা-ব্যবস্থাপনার ভিন্নতা, এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া, সব মিলিয়ে আইনের নৈতিক কর্তৃত্ব দুর্বল হচ্ছে।
আইনের শাসনের একটি প্রধান স্তম্ভ হলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষতা। বাংলাদেশে এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ।
যখন আইন প্রয়োগ রাজনৈতিক সংকেতের অপেক্ষায় থাকে, তখন আইন আর স্বতন্ত্র থাকে না। এটি শাসনের যন্ত্রে পরিণত হয়। ফলে নাগরিকের চোখে আইন ভয় তৈরির উপাদান হয়ে ওঠে, আস্থার নয়।
বিচারব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন হলেও বাস্তব সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করা যায় না। মামলা জট, দীর্ঘসূত্রতা, এবং সংবেদনশীল রাজনৈতিক মামলায় সতর্কতা, এই বাস্তবতাগুলো বিচারব্যবস্থার কার্যকর স্বাধীনতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
আইনের শাসনে ন্যায়বিচার হতে হয় দ্রুত ও দৃশ্যমান; বিলম্বিত ন্যায়বিচার কার্যত অবিচার।
বাংলাদেশে রাজনীতি ও আইনের মধ্যকার সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হচ্ছে। আইন অনেক সময় রাজনৈতিক সমস্যার প্রশাসনিক সমাধান হয়ে ওঠে। এতে স্বল্পমেয়াদে শাসন সহজ হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
আইন তখন আর নিরপেক্ষ রেফারি থাকে না; খেলোয়াড়দের একজন হয়ে যায়।
আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হয় নাগরিক অভিজ্ঞতায়। মানুষ যখন মনে করে-
আইন সুরক্ষা দেবে না
ন্যায় পেতে হলে পরিচয় বা প্রভাব দরকার
মামলা মানেই হয়রানি
তখন আইনের শাসন কাগজে টিকে থাকলেও সমাজে ভেঙে পড়ে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ আইনের শাসনের প্রতিশ্রুতি দেয়, মানবাধিকার ও বিচারিক মানদণ্ডের কথা বলে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা যখন এই বয়ানের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না, তখন রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আইনের শাসন কেবল অভ্যন্তরীণ নৈতিকতা নয়; এটি কূটনৈতিক পুঁজিও।
শাসনের আইন দিয়ে রাষ্ট্র কিছু সময় স্থিতিশীল থাকতে পারে। কিন্তু এই স্থিতিশীলতা ভঙ্গুর। কারণ-
এটি আস্থার ওপর দাঁড়ায় না
এটি সম্মতির বদলে নিয়ন্ত্রণে নির্ভর করে
এটি প্রতিষ্ঠান নয়, ব্যক্তিনির্ভর
ইতিহাস বলে, দীর্ঘমেয়াদে এই মডেল নিজেই সংকট তৈরি করে।
বাংলাদেশ যদি আইনের শাসনের পথে ফিরতে চায়, তবে প্রয়োজন-
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা
বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি
রাজনৈতিক মামলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা
আইনের অপব্যবহারে জবাবদিহি
নাগরিক অধিকারকে নিরাপত্তার সমান গুরুত্ব দেওয়া
এগুলো আদর্শবাদ নয়; রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার বাস্তব শর্ত।
বাংলাদেশ আজ একটি স্পষ্ট দ্বিমুখী পথের সামনে দাঁড়িয়ে, আইনের শাসন অথবা শাসনের আইন। প্রথমটি কঠিন, সময়সাপেক্ষ এবং রাজনৈতিক সংযম দাবি করে; দ্বিতীয়টি সহজ, কিন্তু বিপজ্জনক।
রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় আইন দিয়ে নয়, আইনের প্রতি আস্থা দিয়ে।
বাংলাদেশ কোন পথে যাবে, তা নির্ধারিত হবে এই প্রশ্নের উত্তরে- আইন কি ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করবে, নাকি ক্ষমতাই আইনের সীমা ঠিক করে দেবে?