

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে একের পর এক পদত্যাগে সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া এনসিপি এখন নেতৃত্বের সংকট ও কাঠামোগত দুর্বলতায় ভুগছে।
ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা এনসিপি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ঠিকমতো প্রস্তুত হতে পারেনি।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হলেও নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। নির্বাচন কৌশল ঠিক করা, ইশতেহার প্রণয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো থেমে আছে বা শেষ করা যায়নি।
গত দুই সপ্তাহে এনসিপির অন্তত ১৫ জন জ্যেষ্ঠ নেতা দল ছেড়েছেন। তাদের মধ্যে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি, ইশতেহার কমিটি এবং নীতি ও গবেষণা শাখার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরাও আছেন।
এ ছাড়া কয়েকজন নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ না করলেও কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। এতে দলের সাংগঠনিক শক্তি আরও দুর্বল হয়ে গেছে।
তৃণমূল নেতারা বলছেন, এমন এক সময়ে এই পদত্যাগগুলো বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে, যখন অফিস, মিডিয়া, প্রচার ও আইসিটি সেলের প্রধান ও মূল সদস্যদের অনেকেই নিষ্ক্রিয় বা দলত্যাগ করেছেন।
তাদের মতে, এখন নিয়মিত দলীয় কাজ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। খুব সীমিত পরিসরে কিছু কার্যক্রম চলছে মাত্র।
জোট নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর সময় থেকেই দলের ভেতরের অস্থিরতা প্রকাশ্যে আসে।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তাসনিম জারা দল থেকে পদত্যাগ করেন।
পলিসি ও রিসার্চ উইংয়ের প্রধান এবং ইশতেহার প্রণয়নের দায়িত্বে থাকা খালেদ সাইফুল্লাহও দল ছাড়েন।
দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, তার পদত্যাগের পর ইশতেহার কমিটির কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ নীতিগত কাঠামো তৈরি ও খসড়া লেখায় তার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে কমিটির বাকি সদস্য মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার নিজ নিজ নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত থাকায় ইশতেহার প্রণয়নের কাজ প্রায় স্থবির।
সূত্রগুলো আরও জানায়, খালেদ সাইফুল্লাহ ইশতেহার সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সঙ্গে নিয়ে চলে যাওয়ায় নতুন করে কাজ শুরু করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
পদত্যাগের কারণে দলের একাধিক কার্যকরী ইউনিটও প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। মিডিয়া সেলের প্রধান মুশফিক উস সালেহীন, আইসিটি সেলের প্রধান ফরহাদ আলম ভূঁইয়া, অফিস সেলের প্রধান সালেহ উদ্দিন সিফাত এবং কৃষক উইংয়ের মুখ্য সমন্বয়ক আজাদ খান ভাসানী—সবাই দল ছেড়েছেন।
জোট সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে নারী নেতৃত্বের ওপরও। সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর পর দলীয় কর্মকাণ্ড থেকেও অনেকটাই দূরে রয়েছেন।
আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা, সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব নাহিদা সারোয়ার নিভা আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ না করলেও নির্বাচন ও সাংগঠনিক কাজে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া, নুসরাত তাবাসসুম, মনিরা শারমিন, দক্ষিণাঞ্চল সংগঠক মনজিলা ঝুমা, উত্তরাঞ্চল সংগঠক দ্যুতি অরণ্য চৌধুরী এবং আরও অন্তত পাঁচজন নেতা পদত্যাগ করেছেন বা নিষ্ক্রিয় হয়েছেন।
২৯ ডিসেম্বর ১১ দলীয় জোট ঘোষণার দুদিন পর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর জায়গায় আসিফ মাহমুদকে দলের মুখপাত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন।
আগামী দিনগুলোতে দলটির লক্ষ্য থাকবে অবশিষ্ট সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার, দ্রুত প্রচারণা জোরদার, বাস্তবসম্মতভাবে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ এবং যে সাংগঠনিক শক্তি এখনো আছে, তা নিয়েই নির্বাচনে লড়াই করা।
এনসিপির জন্ম হয় গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে, গণঅভ্যুত্থানের একেবারে কেন্দ্র থেকে—যার নেতৃত্বে ছিল সামনের সারিতে থাকা তরুণরা।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এনসিপি বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো নতুন করে গড়ে তোলা, সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র ভেঙে দেওয়া এবং একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে আসছে।
জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্যদের হাত ধরেই এনসিপির যাত্রা শুরু হয়। এই দুই প্ল্যাটফর্মই শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।