দ্রব্যমূল্য ও ভোটের রাজনীতি: কেন জনঅসন্তোষ ক্ষমতা বদলায় না?

বাংলাদেশের বাস্তবতায় অর্থনৈতিক কষ্ট, রাজনৈতিক আচরণ ও ক্ষমতার স্থায়িত্ব
দ্রব্যমূল্য ও ভোটের রাজনীতি: কেন জনঅসন্তোষ ক্ষমতা বদলায় না?
প্রকাশিত

বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নতুন কোনো ঘটনা নয়। চাল, ডাল, তেল, বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনজীবনে অসন্তোষ বাড়ে, ক্ষোভ জমে, সামাজিক আলোচনায় শাসকের দায় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

অথচ বিস্ময়করভাবে এই অর্থনৈতিক চাপ খুব কম ক্ষেত্রেই সরাসরি ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটায়।

প্রশ্ন তাই গভীর- দ্রব্যমূল্য বাড়ে, মানুষ ক্ষুব্ধ হয়, কিন্তু ক্ষমতা বদলায় না কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে অর্থনীতি নয়, রাজনীতির ভেতরে ঢুকতে হয়; ভোট নয়, ভোটের কাঠামো বুঝতে হয়।

ক্লাসিক ধারণা বনাম বাংলাদেশি বাস্তবতা

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণা বলে, “It’s the economy, stupid.” অর্থাৎ অর্থনৈতিক কষ্টই ভোটে সরকার পরিবর্তনের প্রধান কারণ।

কিন্তু এই সূত্রটি কাজ করে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, যেখানে ভোটের প্রতিযোগিতা বাস্তব, বিকল্প বিশ্বাসযোগ্য এবং ক্ষমতা বদলের পথ খোলা।

বাংলাদেশে এই তিনটি শর্তই দুর্বল। ফলে দ্রব্যমূল্য বাড়লেও তার রাজনৈতিক অনুবাদ ঘটে না।

দ্রব্যমূল্য: ক্ষোভ আছে, দায়বদ্ধতা নেই

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে মানুষ কষ্ট পায়, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই কষ্ট রাজনৈতিক দায়বদ্ধতায় রূপ নেয় না, কারণ-

  • মানুষ জানে, ভোটে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা সীমিত

  • বিকল্প সরকার নিয়ে আস্থা দুর্বল

  • নির্বাচনের ফল পূর্বানুমেয় বলে বিশ্বাস

ফলে ক্ষোভ থাকে ব্যক্তিগত পরিসরে- চা দোকানে, বাসায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে; রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে তার প্রতিফলন ঘটে না।

ভোটের রাজনীতি বনাম শাসনের বাস্তব ভিত্তি

বাংলাদেশে ক্ষমতার ভিত্তি আর কেবল ভোট নয়। রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং দলীয় নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার প্রধান স্তম্ভ। ভোট অনেক সময় হয়ে ওঠে ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক বৈধতা, বাস্তব নিয়ন্ত্রণের নয়।

এই বাস্তবতায় দ্রব্যমূল্যজনিত অসন্তোষ ভোটে প্রতিফলিত হওয়ার কাঠামোগত সুযোগই কম।

কল্যাণ নয়, সহনশীলতার রাজনীতি

বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থা কল্যাণরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি সহনশীলতার ওপর দাঁড়ানো। অর্থাৎ জনগণ কতটা কষ্ট সহ্য করতে পারছে, সেটাই বড় হিসাব। যতক্ষণ না দ্রব্যমূল্য এমন পর্যায়ে যায় যেখানে সামাজিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ে, ততক্ষণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের চাপ তৈরি হয় না।

এই সীমারেখা সরকারগুলো ভালোভাবেই জানে।

উন্নয়ন বয়ান বনাম দৈনন্দিন কষ্ট

দ্রব্যমূল্যের চাপের বিপরীতে সরকার উন্নয়নের বড় ছবি তুলে ধরে- মেগা প্রকল্প, অবকাঠামো, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। এই বয়ান মধ্যবিত্তের একটি অংশকে আশ্বস্ত করে, যদিও নিত্যপণ্যের কষ্ট তাতে কমে না।

এখানে রাজনৈতিক কৌশলটি সূক্ষ্ম, বর্তমান কষ্টকে ভবিষ্যৎ আশার সঙ্গে বিনিময় করা।

বিরোধী রাজনীতির দুর্বলতা

দ্রব্যমূল্যের বাড়াবাড়ি ক্ষমতা বদলায় না, এর বড় কারণ কার্যকর বিরোধী শক্তির অনুপস্থিতি। দ্রব্যমূল্য নিয়ে আন্দোলন হয়, বক্তব্য আসে, কিন্তু তা জাতীয় রাজনৈতিক ঢেউ তৈরি করতে পারে না।

কারণ-

  • সংগঠিত আন্দোলনের সুযোগ সীমিত

  • বিরোধী দলগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে

  • বিকল্প অর্থনৈতিক রূপরেখা অনুপস্থিত

ফলে ক্ষোভের কোনো রাজনৈতিক ঠিকানা থাকে না।

দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের ভিন্ন প্রতিক্রিয়া

দ্রব্যমূল্যে বৃদ্ধিতে দরিদ্র শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে কম সংগঠিত।

মধ্যবিত্ত বেশি সোচ্চার হলেও তারা স্থিতিশীলতা হারানোর ভয়ে ক্ষমতা পরিবর্তনে অনীহা দেখায়।

এই দ্বৈত বাস্তবতা জনঅসন্তোষকে বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত করে রাখে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও দায় এড়ানোর রাজনীতি

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক কারণ- যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, মুদ্রাস্ফীতি সংক্রান্ত যুক্তিগুলো শাসকগোষ্ঠী দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে।

এতে সরকার আংশিকভাবে দায়মুক্তি পায়, আর জনগণের ক্ষোভ রাজনৈতিক রূপ নিতে পারে না।

জনঅসন্তোষে কখন ক্ষমতা বদলায়?

ইতিহাস বলছে, কেবল দ্রব্যমূল্যের নিমিত্তে নয়, ক্ষমতা বদলায় যখন-

  • অর্থনৈতিক কষ্ট + রাজনৈতিক বিকল্প

  • ক্ষোভ + সংগঠিত আন্দোলন

  • দুর্দশা + পরিবর্তনের বিশ্বাস

এগুলোর বহিঃপ্রকাশ একসঙ্গে আসে। বাংলাদেশেও যতবার এমনটা হয়েছে, ততবারই গণজোয়ারে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলেছে ।

দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি

দ্রব্যমূল্যজনিত অসন্তোষ রাজনৈতিক রূপ না নিলেও তা জমতে থাকে।

এই জমা ক্ষোভ হঠাৎ বিস্ফোরণে রূপ নিতে পারে, যা নিয়ন্ত্রিত রাজনীতির জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।

ক্ষমতা তখন ধাপে ধাপে নয়, বরং হঠাৎ ও অপ্রত্যাশিতভাবে বদলায়।

বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্য মানুষের জীবনকে নাজুক করে তুলছে, কিন্তু ভোটের রাজনীতিকে নাড়িয়ে দিতে পারছে না। কারণ ভোট আর ক্ষমতার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক দুর্বল।

জনঅসন্তোষ আছে, কিন্তু তার রাজনৈতিক ভাষা নেই।

এই বাস্তবতায় ক্ষমতা টিকে থাকে, কিন্তু আস্থাহীনতার ওপর। আর ইতিহাসের শিক্ষা হলো, আস্থাহীন ক্ষমতা যত শক্তই দেখাক, তার ভিতরেই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা লুকিয়ে থাকে।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com