রাজনৈতিক আনুগত্য কি আজ যোগ্যতার চেয়ে শক্তিশালী?

রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতার বদলে আনুগত্যের উত্থান,উন্নত ও স্ব-নির্ভর রাষ্ট্র গড়ার পথে অদেখা বাঁধা
রাজনৈতিক আনুগত্য কি আজ যোগ্যতার চেয়ে শক্তিশালী?
প্রকাশিত

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি মৌলিক প্রত্যাশা হলো- ক্ষমতা, পদ ও সুযোগ বণ্টিত হবে যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে আরেকটি প্রশ্ন:

আজ কি যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যই বেশি কার্যকর মুদ্রা?

এই প্রশ্নটি শুধু প্রশাসনিক নিয়োগ বা দলীয় রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিকতা, শাসনব্যবস্থার দক্ষতা এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে সরাসরি স্পর্শ করে।

যোগ্যতা বনাম আনুগত্য: ধারণাগত দ্বন্দ্ব

যোগ্যতা (Merit) মানে-

  • দক্ষতা

  • পেশাগত সক্ষমতা

  • অভিজ্ঞতা ও পারফরম্যান্স

আর রাজনৈতিক আনুগত্য (Political Loyalty) মানে-

  • নির্দিষ্ট দল বা নেতৃত্বের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন

  • সমালোচনাহীন আনুগত্য

  • প্রয়োজনের সময় রাজনৈতিক অবস্থান রক্ষা

সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন যোগ্যতা সিদ্ধান্তের মানদণ্ড না হয়ে আনুগত্য হয়ে ওঠে ক্ষমতা পাওয়ার প্রধান শর্ত।

কেন আনুগত্য শক্তিশালী হয়ে উঠছে?

ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার রাজনীতি

ক্ষমতাসীন শক্তির প্রধান লক্ষ্য হয়-

  • শাসন দীর্ঘায়িত করা

  • অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ দমন করা

  • প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণে রাখা

এই বাস্তবতায় যোগ্য কিন্তু স্বাধীনচেতা মানুষ হয়ে ওঠে ঝুঁকি, আর আনুগত্যশীল কিন্তু মাঝারি দক্ষ ব্যক্তি হয়ে ওঠে নিরাপদ পছন্দ।

রাজনীতির ব্যক্তিকেন্দ্রিক রূপান্তর

দলীয় রাজনীতি যখন আদর্শভিত্তিক না হয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়-

  • নেতা হয়ে ওঠেন দল

  • ভিন্নমত হয়ে ওঠে বিশ্বাসঘাতকতা

ফলে যোগ্যতা নয়, প্রশ্ন ওঠে-

“সে কতটা বিশ্বস্ত?”

প্রশাসনের রাজনৈতিককরণ

প্রশাসন আদর্শভাবে নিরপেক্ষ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়-

  • নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলিতে রাজনৈতিক বিবেচনা

  • ‘বিশ্বস্ত’ কর্মকর্তার অগ্রাধিকার

  • দক্ষ কিন্তু নিরপেক্ষ কর্মকর্তার কোণঠাসা হওয়া

এর ফলে প্রশাসন হয়ে ওঠে শাসনের যন্ত্র, রাষ্ট্রের নয়।

এর প্রভাব রাষ্ট্র ও সমাজে

🔻 শাসনব্যবস্থার মানের অবনতি

যখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান কম দক্ষ কিন্তু অনুগত ব্যক্তিরা-

  • সিদ্ধান্তের মান পড়ে যায়

  • নীতিনির্ধারণ হয় দুর্বল

  • দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি জমতে থাকে

রাষ্ট্র তখন চলে সংকট ব্যবস্থাপনায়, উন্নয়ন কৌশলে নয়।

🔻 মেধার অবমূল্যায়ন ও ব্রেইন ড্রেইন

যোগ্য মানুষ যখন দেখে-

  • পরিশ্রমের মূল্য নেই

  • আনুগত্যই একমাত্র সিঁড়ি

তখন সে হয়-

  • দেশ ছাড়ে

  • রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়

  • নীরব দর্শকে পরিণত হয়

এটি রাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের নীরব বিপর্যয়।

🔻 দুর্নীতির কাঠামোগত বিস্তার

আনুগত্যভিত্তিক নিয়োগে জবাবদিহি দুর্বল হয়। কারণ-

  • অনুগতরা ক্ষমতার প্রতি দায়বদ্ধ, জনগণের প্রতি নয়

  • ব্যর্থতার দায় রাজনৈতিকভাবে আড়াল হয়

ফলে দুর্নীতি হয় ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক।

রাজনৈতিক আনুগত্য কি সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়?

বাস্তবতা হলো-

রাজনীতিতে আনুগত্য পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয়। যে কোনো সরকারই চায়-

  • নীতিগত সমর্থন

  • বাস্তবায়নে সহযোগিতা

কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন- আনুগত্য যোগ্যতার বিকল্প হয়ে ওঠে, সহায়ক নয়।

সুস্থ রাষ্ট্রে আনুগত্য থাকে নীতির প্রতি, ব্যক্তির প্রতি নয়।

আন্তর্জাতিক তুলনা: আমরা একা নই

অনেক দেশেই দেখা গেছে-

  • কর্তৃত্ববাদী শাসনে আনুগত্য সর্বোচ্চ মূল্য পায়

  • গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়

ইতিহাস বলছে-

যে রাষ্ট্র যোগ্যতার বদলে আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয়, সে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়—যত শক্তিশালীই মনে হোক না কেন।

উত্তরণের পথ: যোগ্যতাকে কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায়?

১. প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা

২. নিয়োগ ও পদোন্নতিতে নিরপেক্ষ কাঠামো

৩. রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে আত্মসংযম

৪. শক্তিশালী জবাবদিহি ব্যবস্থা

৫. নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা

যোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা মানে কেবল দক্ষ লোক আনা নয়- এটি রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার পুনর্গঠন।

আনুগত্যের রাষ্ট্র না যোগ্যতার রাষ্ট্র?

রাজনৈতিক আনুগত্য স্বল্পমেয়াদে ক্ষমতাকে নিরাপদ করতে পারে,

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা তাই গভীর ও রাজনৈতিক-

আমরা কি এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে ক্ষমতার চাবিকাঠি আনুগত্যে, নাকি এমন রাষ্ট্র, যেখানে রাষ্ট্র টিকে থাকে যোগ্যতায়?

এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে-

রাষ্ট্র শক্তিশালী দেখাবে, না সত্যিই শক্তিশালী হবে।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com