

গণতন্ত্র কেবল ভোটের প্রক্রিয়া নয়; এটি মূলত ক্ষমতার ওপর ধারাবাহিক নজরদারি ও প্রশ্ন তোলার ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে একটি কার্যকর, সংগঠিত ও বিশ্বাসযোগ্য বিরোধী রাজনীতি। যখন সেই বিরোধিতা দুর্বল হয়ে পড়ে বা কার্যত অনুপস্থিত থাকে, তখন রাষ্ট্র কাঠামো দৃশ্যত স্থিতিশীল হলেও ভেতরে ভেতরে তা হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ, অসমতল ও অনিশ্চিত।
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রশ্ন তাই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, বিরোধিতা অনুপস্থিত থাকলে গণতন্ত্র কতটা কার্যকর থাকে, এবং রাষ্ট্র কী ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে?
গণতন্ত্রে বিরোধিতা মানে শুধু ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা নয়। এর কয়েকটি মৌলিক ভূমিকা রয়েছে-
রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে বিকল্প মত হাজির করা
ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা
আইন ও নীতিনির্ধারণে ভারসাম্য আনা
জনগণের ক্ষোভ ও অসন্তোষকে প্রাতিষ্ঠানিক পথে প্রবাহিত করা
এই ভূমিকা অনুপস্থিত হলে গণতন্ত্র কার্যত একপাক্ষিক শাসনে পরিণত হয়। যেখানে সিদ্ধান্ত হয়, কিন্তু প্রশ্ন ওঠে না।
বাংলাদেশে বিরোধিতা দুর্বল বা অনুপস্থিত থাকার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে-
১. নির্বাচনী প্রতিযোগিতার সংকট
নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে বিরোধী দলগুলো বারবার সংকটে পড়েছে। ফলে সংসদ ও স্থানীয় সরকারে বিরোধী উপস্থিতি সীমিত বা প্রতীকী হয়ে উঠেছে।
২. প্রশাসনিক ও আইনি চাপ
মামলা, নিয়ন্ত্রণ, অনুমতির রাজনীতি বিরোধী দলকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে। রাজপথ ও সংসদ—দুটো ক্ষেত্রেই কার্যকর উপস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে।
৩. সাংগঠনিক ও নেতৃত্ব সংকট
বিরোধী দলগুলোর ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্বের নবায়ন, আদর্শগত স্পষ্টতা ও মাঠপর্যায়ের সংগঠনের দুর্বলতা স্পষ্ট।
বিরোধিতা অনুপস্থিত থাকলে রাষ্ট্র কয়েকটি গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে পড়ে-
১. ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ
যখন প্রশ্নকারী নেই, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ সীমিত একটি গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়। এতে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বাড়ে, সংশোধনের সুযোগ কমে।
২. নীতিনির্ধারণে বাস্তবতার বিচ্ছিন্নতা
বিরোধী কণ্ঠ না থাকলে ক্ষমতাসীনরা অনেক সময় জনজীবনের প্রকৃত সমস্যা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। নীতি হয় প্রশাসনিক, কিন্তু জনমুখী নয়।
৩. আইনের শাসনের ক্ষয়
বিরোধিতা দুর্বল হলে আইন প্রয়োগ নির্বাচনী ও রাজনৈতিক রঙ ধারণ করতে পারে। এতে আইনের শাসনের বদলে ‘শাসনের আইন’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
সংসদ গণতন্ত্রের কেন্দ্র। কিন্তু কার্যকর বিরোধী দল না থাকলে সংসদ-
বিতর্কহীন
প্রশ্নহীন
প্রায় একমুখী সিদ্ধান্তের জায়গা
এতে সংসদ জনগণের প্রতিনিধি না হয়ে প্রশাসনিক অনুমোদনের মঞ্চে পরিণত হয়।
বিরোধিতা যখন সংসদে জায়গা পায় না, তখন তা রাজপথে প্রকাশ পায়। কিন্তু-
দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন টেকসই নয়
দমন-পীড়নে তা ভেঙে পড়ে
সমঝোতায় গিয়ে থেমে যায়
ফলে রাজপথও বিরোধিতার পূর্ণ বিকল্প হতে পারে না।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে-
নির্বাচন
বিরোধী রাজনীতির সক্রিয়তা
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
বিরোধিতা অনুপস্থিত থাকলে রাষ্ট্রকে প্রায়ই নিয়ন্ত্রিত বা হাইব্রিড শাসনব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা কূটনৈতিক চাপ ও বিশ্বাসঘাটতির জন্ম দেয়।
তাত্ত্বিকভাবে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম বিরোধিতার শূন্যতা পূরণ করতে পারে। কিন্তু তারা-
নির্বাচিত নয়
সরাসরি রাজনৈতিক দায় বহন করে না
প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা সীমিত
ফলে তারা সতর্কবার্তা দিতে পারে, কিন্তু ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে পারে না।
ইতিহাস বলছে, গণতন্ত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতা অনুপস্থিত থাকলে জন্ম নেয়-
অনানুষ্ঠানিক অসন্তোষ
হঠাৎ বিস্ফোরণধর্মী আন্দোলন
রাজনীতিবিমুখ সমাজ
যা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদে আরও বিপজ্জনক।
সমাধান কোনো একক পক্ষের হাতে নয়। প্রয়োজন-
বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন
বিরোধী রাজনীতির সাংগঠনিক পুনর্গঠন
প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা
সংসদকে কার্যকর বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত করা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বিরোধিতাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে নয়, গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া।
গণতন্ত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা হলো- যখন কেউ প্রশ্ন করে না, কিন্তু সবাই মেনে নেয়। বিরোধিতা অনুপস্থিত থাকলে রাষ্ট্র হয়তো সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রিত ও স্থিতিশীল দেখাতে পারে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তা দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন তাই-
আমরা কি একটি নীরব কিন্তু নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র চাই, নাকি প্রশ্নমুখর কিন্তু টেকসই গণতন্ত্র?
ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা বলছে, দ্বিতীয় পথটাই ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও, রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য সেটিই সবচেয়ে নিরাপদ।