ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বাংলাদেশের অবস্থান কী হওয়া উচিত?

ভূরাজনীতি, জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত ভারসাম্যের কঠিন সমীকরণ
ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বাংলাদেশের অবস্থান কী হওয়া উচিত?
প্রকাশিত

ইন্দো-প্যাসিফিক আজ আর কোনো কূটনৈতিক স্লোগান নয়; এটি একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক মঞ্চ। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপীয় শক্তিগুলো, সবাই এই অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে ব্যস্ত।

এমন বাস্তবতায় প্রশ্নটি বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত ও অস্তিত্বমূলক: ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে আমাদেরে অবস্থান কী হওয়া উচিত?

এই প্রশ্নের উত্তর একক কোনো শব্দে দেওয়া যায় না। কারণ এটি নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কূটনীতি, সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

ইন্দো-প্যাসিফিক: ধারণা ও বাস্তবতা

ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণার মূল লক্ষ্য হলো-

  • সমুদ্রপথের নিরাপত্তা

  • বাণিজ্যিক চলাচলের স্বাধীনতা

  • আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য

  • চীনের প্রভাব মোকাবিলায় বহুপাক্ষিক জোট গঠন

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছে এটি মূলত একটি কৌশলগত নিরাপত্তা কাঠামো; আর চীনের দৃষ্টিতে এটি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ ও ঘেরাওয়ের প্রচেষ্টা।

বাংলাদেশ এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে না থাকলেও, তার ভৌগোলিক অবস্থান তাকে অনিবার্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

বাংলাদেশের ভূকৌশলগত গুরুত্ব

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। বঙ্গোপসাগর, সমুদ্র বাণিজ্য, চট্টগ্রাম ও পায়রা বন্দর, এবং দক্ষিণ এশিয়ার বাজার, সব মিলিয়ে বাংলাদেশ কেবল একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র নয়; এটি একটি কৌশলগত নোড।

এই বাস্তবতা বাংলাদেশকে সুযোগ দেয়, আবার ঝুঁকিও বাড়ায়।

বড় শক্তির চাপ ও বাংলাদেশের দোলাচল

ইন্দো-প্যাসিফিক প্রশ্নে বাংলাদেশ তিন ধরনের চাপের মুখে-

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা চাপ:

গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নিরাপত্তা সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক কাঠামোতে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান।

চীনের কৌশলগত প্রত্যাশা:

অবকাঠামো বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিনিময়ে নিরপেক্ষতা বা নীরব সমর্থন।

ভারতের আঞ্চলিক সংবেদনশীলতা:

বাংলাদেশ যেন এমন কোনো জোটে না যায়, যা ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ায়।

এই তিন বলয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই বাংলাদেশের প্রধান কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

‘পক্ষ নেওয়া’ কি বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত?

বাংলাদেশের মতো মধ্যম আকারের রাষ্ট্রের জন্য কোনো একটি পরাশক্তির পক্ষে প্রকাশ্যে দাঁড়ানো বাস্তবসম্মত নয়। কারণ-

  • অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিক নির্ভরশীল

  • নিরাপত্তায় কারও সঙ্গে সামরিক জোটে যাওয়ার সক্ষমতা বা প্রয়োজন নেই

  • অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও সীমিত

অতএব, জোটনিরপেক্ষতা নয়, কৌশলগত ভারসাম্য, এটাই বাংলাদেশের বাস্তব পথ।

ইন্দো-প্যাসিফিকে বাংলাদেশের আদর্শ অবস্থান

বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো-

১. অর্থনীতি-কেন্দ্রিক অংশগ্রহণ

বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্ত হবে-

  • বাণিজ্য

  • বিনিয়োগ

  • সমুদ্র অর্থনীতি (Blue Economy)

  • সংযোগ (Connectivity)

নিরাপত্তা জোট নয়, অর্থনৈতিক সহযোগিতাই হবে প্রধান প্রবেশদ্বার।

২. সামরিক নিরপেক্ষতা, কূটনৈতিক সক্রিয়তা

বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জানাবে-

  • কোনো সামরিক জোটের অংশ হবে না

  • কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে না

কিন্তু একই সঙ্গে আঞ্চলিক সংলাপ, সমুদ্র নিরাপত্তা ও মানবিক সহযোগিতায় সক্রিয় থাকবে।

৩. সার্বভৌমত্ব ও সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা

বাংলাদেশের অবস্থান হবে-

“আমরা অংশীদার হতে পারি, কিন্তু কোনো কৌশলের উপকরণ নই।”

ইন্দো-প্যাসিফিক কাঠামোতে যুক্ত হলেও জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো শর্ত গ্রহণ করা যাবে না।

৪. বহুপাক্ষিক ভারসাম্যের কূটনীতি

বাংলাদেশকে একক শক্তির বদলে-

  • ASEAN

  • BIMSTEC

  • UN

  • IORA

এই ধরনের বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগাতে হবে। এতে চাপ কমে, দরকষাকষির শক্তি বাড়ে।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ইন্দো-প্যাসিফিক

বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসিফিক অবস্থান কেবল পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়; এটি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত।

  • গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রশ্নে চাপ

  • সামরিক সহযোগিতা নিয়ে সন্দেহ

  • জাতীয়তাবাদী আবেগ

এই বিষয়গুলো উপেক্ষা করে কোনো কৌশল টেকসই হবে না। স্বচ্ছতা ও জাতীয় ঐকমত্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

ঝুঁকি: ভুল অবস্থানের মূল্য

ভুল অবস্থান নিলে বাংলাদেশ যে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে-

  • অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্যিক ক্ষতি

  • উন্নয়ন সহযোগিতায় অনিশ্চয়তা

  • আঞ্চলিক উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়া

  • অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ

অতএব, আবেগ নয়, বাস্তববাদই একমাত্র পথ।

ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত- স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বার্থনির্ভর। বাংলাদেশ কোনো শক্তির প্রতিপক্ষ নয়, আবার নিস্ক্রিয় দর্শকও হতে পারে না।

এই অঞ্চলে বাংলাদেশের শক্তি তার ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং কূটনৈতিক বাস্তববাদে।

পক্ষ নেওয়ার রাজনীতি নয়, দরকষাকষির রাজনীতিই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও লাভজনক পথ।

ইন্দো-প্যাসিফিক বাংলাদেশের জন্য হুমকি নয়, যদি বাংলাদেশ জানে, কোথায় দাঁড়াবে এবং কীভাবে দাঁড়াবে।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com