ত্যাগের রাজনীতি থেকে নিরাপদ ক্যারিয়ার: আদর্শের রাজনৈতিক পরাজয়

ক্ষমতা, সুযোগ ও বিশ্বাসের বদলে যাওয়া সমীকরণ
ত্যাগের রাজনীতি থেকে নিরাপদ ক্যারিয়ার: আদর্শের রাজনৈতিক পরাজয়
প্রকাশিত

একসময় রাজনীতি ছিল ত্যাগ, আদর্শ ও বিশ্বাসের দীর্ঘ যাত্রা। রাষ্ট্র পরিবর্তনের স্বপ্ন, সামাজিক ন্যায়ের অঙ্গীকার এবং জনগণের জন্য আত্মনিবেদনের ভাষাই ছিল রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু সমসাময়িক বাস্তবতায় প্রশ্নটি ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে- রাজনীতি কি এখন আর আদর্শচর্চা নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ পেশা? যেখানে ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, আর্থিক নিরাপত্তা ও ক্ষমতার স্থায়িত্ব আদর্শকে ছাপিয়ে গেছে?

আদর্শ থেকে পেশায় রূপান্তরের প্রেক্ষাপট:

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আশির দশক পর্যন্ত আদর্শিক বিভাজন স্পষ্ট ছিল।

স্বৈরতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র বনাম পুঁজিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। রাজনৈতিক পরিচয় মানেই ছিল একটি বিশ্বাসব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আদর্শিক রেখাগুলো ঝাপসা হয়েছে। বৈশ্বিক পুঁজিবাদ, নির্বাচনী রাজনীতির ব্যয়বহুলতা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ রাজনীতিকে ধীরে ধীরে একটি পেশাগত কাঠামোতে রূপ দিয়েছে। এখন রাজনীতিতে আসা মানে অনেকের কাছে ‘ঝুঁকিপূর্ণ ত্যাগ’ নয়, বরং ‘ক্যারিয়ার বিনিয়োগ’।

রাজনীতি একটি পেশা হলে কী বদলায়:

পেশা হিসেবে রাজনীতি মানে-

  • আয় ও সুবিধার নিশ্চয়তা

  • পদ ও প্রভাবের মাধ্যমে সামাজিক মর্যাদা

  • ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার নিরাপত্তা

এই বাস্তবতায় আদর্শ হয়ে পড়ে আলোচনার ভাষা, সিদ্ধান্তের চালিকা শক্তি নয়। দল বদল, অবস্থান পরিবর্তন বা নীতিগত আপস আর লজ্জার বিষয় থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।

আদর্শের জায়গা দখল করেছে সুযোগবাদিতা?

আদর্শিক রাজনীতিতে আপস ছিল সীমিত; সুযোগবাদী রাজনীতিতে আপসই প্রধান কৌশল। নির্বাচনের আগে ও পরে বক্তব্যের ভিন্নতা, নীতির চেয়ে সংখ্যার গুরুত্ব এবং ব্যক্তিগত আনুগত্যের ভিত্তিতে রাজনীতি, সবই এই পেশাগত রাজনীতির লক্ষণ।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে দেখা যায়, বহু নেতা আদর্শগত অবস্থান না বদলালেও কার্যত তার বিপরীত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কারণ আদর্শ নয়, ক্ষমতার নিকটতা এখন রাজনীতির প্রধান মুদ্রা।

রাষ্ট্রক্ষমতা ও পেশাগত রাজনীতি:

রাষ্ট্রক্ষমতা রাজনীতিকে পেশায় রূপান্তরের প্রধান অনুঘটক। ক্ষমতায় থাকা মানে-

  • প্রশাসনিক প্রভাব

  • অর্থনৈতিক সুযোগ

  • আইনি নিরাপত্তা

ফলে রাজনীতি হয়ে ওঠে ক্ষমতায় যাওয়ার নয়, বরং ক্ষমতার ভেতরে থাকার প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় আদর্শ টিকে থাকতে পারে না; টিকে থাকে দক্ষ নেটওয়ার্ক ও আনুগত্য।

আদর্শহীন রাজনীতির সামাজিক মূল্য:

রাজনীতি যখন পেশা হয়, তখন জনগণ নাগরিক থেকে হয়ে ওঠে ভোটার বাজার। প্রতিশ্রুতি হয় নির্বাচনী পণ্য, আর জনস্বার্থ হয়ে পড়ে স্লোগান।

এর ফলাফল-

  • ভোটার অনাস্থা বৃদ্ধি

  • তরুণদের রাজনীতি বিমুখতা

  • রাজনীতিতে নৈতিক নেতৃত্বের অভাব

  • সহিংসতা ও দখলদারিত্বের বিস্তার

এই সংকট কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি সামাজিক আস্থার সংকট।

গণতন্ত্র কি এতে দুর্বল হয়?

হ্যাঁ, পেশাগত রাজনীতি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। কারণ গণতন্ত্র আদর্শ ও নৈতিকতার ওপর দাঁড়িয়ে, আর পেশাগত রাজনীতি দাঁড়িয়ে স্বার্থ ও হিসাবের ওপর।

যেখানে আদর্শ নেই, সেখানে জবাবদিহিও দুর্বল হয়। জনপ্রতিনিধি জনগণের প্রতিনিধি না হয়ে হয়ে ওঠে দলের বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধি।

তবে কি আদর্শ একেবারেই মৃত?

না। আদর্শ মৃত নয়, কিন্তু তা প্রান্তিক। এখনো সমাজের একাংশ রাজনীতিকে বিশ্বাসের জায়গা মনে করে। নাগরিক আন্দোলন, ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি এবং তরুণদের ন্যায়ভিত্তিক উদ্যোগ প্রমাণ করে- আদর্শের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়নি।

সমস্যা হলো, এই আদর্শিক কণ্ঠগুলো রাষ্ট্রীয় ও দলীয় রাজনীতিতে জায়গা পাচ্ছে না।

উত্তরণের সম্ভাবনা:

রাজনীতিকে আবার আদর্শভিত্তিক করতে হলে-

  • দলীয় রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করা

  • রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা আনা

  • তরুণ ও নতুন নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি

  • আদর্শিক বিতর্ককে উৎসাহ দেওয়া

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- রাজনীতিকে আবার সম্মানজনক ত্যাগের ক্ষেত্র হিসেবে পুনর্গঠন করা।

রাজনীতি আজ অনেকের কাছে পেশা, এটা বাস্তবতা। কিন্তু রাজনীতি কেবল পেশা হয়ে গেলে রাষ্ট্র বাঁচে না, সমাজও এগোয় না। আদর্শ ছাড়া রাজনীতি দিকহীন ক্ষমতার খেলায় পরিণত হয়।

সুতরাং, প্রশ্ন এটা নয়- রাজনীতি পেশা কিনা;

প্রশ্ন হলো- পেশার ভেতরেও কি আদর্শের জায়গা ফিরিয়ে আনা যাবে?

এই উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের গণতন্ত্রের

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com