

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী রাজনীতি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতার স্বেচ্ছাচার রোধের প্রধান নিয়ন্ত্রক। কিন্তু বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী রাজনীতি আজ অস্তিত্বগত প্রশ্নের মুখে। প্রশ্নটা আর কেবল সরকার–বিরোধী দ্বন্দ্বের নয়; বরং এটি রূপ নিচ্ছে একটি গভীর কাঠামোগত সংকটে, বিরোধী রাজনীতি কি ধীরে ধীরে নিঃশেষ হচ্ছে, নাকি নতুন রূপে নিজেকে পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে?
বিরোধী রাজনীতির বর্তমান চিত্র: সংকুচিত পরিসর
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিরোধী রাজনীতির মাঠ উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। রাজপথে আন্দোলনের সক্ষমতা কমেছে, সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়েছে, আর সংসদীয় বিরোধিতা কার্যত প্রতীকী হয়ে পড়েছে। নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সীমিত সুযোগ বিরোধী শক্তিকে কার্যত কোণঠাসা করে ফেলেছে।
এ অবস্থায় বিরোধী রাজনীতি অনেক সময় প্রতিরোধমূলক নয়, বরং টিকে থাকার রাজনীতিতে রূপ নিয়েছে, যা গণতন্ত্রের জন্য অস্বাস্থ্যকর সংকেত।
রাষ্ট্রীয় শক্তি ও প্রশাসনিক বাস্তবতা
বিরোধী রাজনীতির সংকটের একটি বড় কারণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে রাজনীতির ঘনিষ্ঠ সংযোগ বিরোধী কর্মকাণ্ডকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। মামলা, গ্রেপ্তার ও নজরদারির ভয়ে অনেক রাজনৈতিক কর্মসূচি আগেই ভেঙে পড়ে।
ফলে বিরোধী রাজনীতি রাজপথের পরিবর্তে কখনো কখনো কেবল বয়ানভিত্তিক সমালোচনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, যার বাস্তব রাজনৈতিক প্রভাব কম।
নির্বাচন, অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব সংকট
গণতন্ত্রে বিরোধী রাজনীতির শক্তির প্রধান উৎস হলো নির্বাচন। কিন্তু যখন নির্বাচনী প্রতিযোগিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন বিরোধী শক্তির পুনর্গঠন কঠিন হয়ে পড়ে। সংসদে কার্যকর বিরোধী দল না থাকলে নীতি-আলোচনা ও জবাবদিহি দুর্বল হয়, আর বিরোধী রাজনীতি হয়ে ওঠে সংসদের বাইরের অনিশ্চিত আন্দোলননির্ভর প্রক্রিয়া।
এই বাস্তবতায় ভোটারদের একটি বড় অংশও বিরোধী রাজনীতির ওপর আস্থা হারাচ্ছে, যা সংকটকে আরও গভীর করে।
নেতৃত্ব সংকট ও সাংগঠনিক স্থবিরতা
বিরোধী রাজনীতির আরেকটি বড় সমস্যা হলো নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও নবায়নের অভাব। দীর্ঘদিন একই মুখ, একই কৌশল ও একই ভাষ্য জনমনে ক্লান্তি তৈরি করেছে। তরুণ নেতৃত্ব উঠে আসার পথ সংকীর্ণ হওয়ায় বিরোধী রাজনীতি প্রজন্মগত বিচ্ছিন্নতার শিকার হচ্ছে।
একই সঙ্গে তৃণমূল সংগঠনগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায় আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তিও ক্ষয়ে যাচ্ছে।
সামাজিক পরিবর্তন ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
বাংলাদেশের সমাজ দ্রুত বদলাচ্ছে। তরুণ জনসংখ্যা, ডিজিটাল যোগাযোগ, মধ্যবিত্তের বিস্তার। কিন্তু বিরোধী রাজনীতি এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা থাকলেও সেটি সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারছে না।
এই ব্যবধান বিরোধী রাজনীতিকে প্রাসঙ্গিকতার সংকটে ফেলছে।
রূপান্তরের সম্ভাবনা: সংকটই কি সুযোগ?
তবুও এই সংকটের মধ্যেই রূপান্তরের সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। ইতিহাস বলে, বিরোধী রাজনীতি প্রায়ই সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের জন্ম দিয়েছে। তবে সেই রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন-
আত্মসমালোচনা ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাস
তরুণ ও পেশাজীবী শ্রেণিকে অন্তর্ভুক্ত করা
ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি- দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, সেবা খাত।
শান্তিপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের নতুন ভাষা
সংসদ ও রাজপথের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল
রূপান্তর মানে শুধু সরকারবিরোধিতা নয়; বরং বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তা হাজির করা।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির কথা বললেও বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে অভ্যন্তরীণ শক্তির ওপর। বাইরের সমর্থন কখনোই দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প হতে পারে না। শক্তিশালী বিরোধী রাজনীতি গড়ে ওঠে স্থানীয় সমাজ, সংগঠন ও নেতৃত্বের মধ্য দিয়েই।
বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এটি যদি পুরোনো কৌশল ও সংকীর্ণ রাজনীতিতে আটকে থাকে, তবে সংকটই হবে তার স্থায়ী পরিচয়। কিন্তু যদি আত্মসমালোচনা ও রূপান্তরের সাহস দেখাতে পারে, তবে এই সংকটই হয়ে উঠতে পারে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর, বিরোধী রাজনীতি কি টিকে থাকার লড়াইয়ে আটকে থাকবে, নাকি নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলবে?