

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘মানবাধিকার’ এখন আর কেবল নৈতিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক ইস্যু। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানবাধিকার প্রশ্নে পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ বেড়েছে, নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা, বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড, সবই এই আলোচনার কেন্দ্রে। প্রশ্ন হলো, এই চাপ কতটা বাস্তব মানবাধিকার উদ্বেগ থেকে আসছে, আর কতটা আন্তর্জাতিক রাজনীতির হিসাব–নিকাশের ফল?
পশ্চিমা চাপের পটভূমি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সহিংসতা, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার, ডিজিটাল আইন, এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে তাদের উদ্বেগ বারবার প্রকাশ পেয়েছে। ভিসা নীতি, নিষেধাজ্ঞা বা কূটনৈতিক বিবৃতির মাধ্যমে এই উদ্বেগ দৃশ্যমান রূপ পেয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলোর দাবি সাধারণত একটাই, গণতান্ত্রিক মানদণ্ড বজায় রাখা এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু এই দাবির ভাষা ও সময় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নও কম নয়।
বাস্তব মানবাধিকার উদ্বেগ: অস্বীকারযোগ্য নয়
এটা স্বীকার করতেই হবে যে, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবেও বহু প্রশ্ন রয়েছে। মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক সহিংসতা, মামলা-গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া জনআস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মানবাধিকার এখানে কেবল বিদেশি এজেন্ডা নয়; এটি নাগরিকের দৈনন্দিন বাস্তবতা।
এই জায়গায় পশ্চিমা চাপ অনেক সময় অভ্যন্তরীণ নাগরিক সমাজের উদ্বেগের সঙ্গে মিল খুঁজে পায়, যা একে পুরোপুরি অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ কমিয়ে দেয়।
রাজনীতির বাস্তবতা: মানবাধিকার কি হাতিয়ার?
তবে প্রশ্ন ওঠে- মানবাধিকার কি কেবল নৈতিক অবস্থান, নাকি ভূরাজনৈতিক হাতিয়ারও? আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মানবাধিকার প্রায়ই কৌশলগত চাপের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কেউ কেউ মনে করেন, এই চাপ আঞ্চলিক প্রভাব, নিরাপত্তা স্বার্থ ও কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গেও জড়িত।
বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার, চীন-ভারত সমীকরণ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার প্রশ্ন কখনো কখনো রাজনৈতিক বার্তার বাহক হয়ে ওঠে।
সার্বভৌমত্ব বনাম দায়বদ্ধতা
বাংলাদেশ সরকার বারবার বলে আসছে, মানবাধিকার ইস্যুতে বিদেশি চাপ সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ। এই যুক্তির একটি শক্ত ভিত্তি রয়েছে। প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজস্ব আইনি ও সামাজিক বাস্তবতা আছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির স্বাক্ষরকারী, যা কিছু ন্যূনতম দায়বদ্ধতা তৈরি করে।
এই দ্বন্দ্বই বর্তমান কূটনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে গিয়ে যেন নাগরিক অধিকার অবহেলিত না হয়।
নির্বাচন ও মানবাধিকার: অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত
পশ্চিমা চাপের বড় অংশ ঘিরে রয়েছে নির্বাচন। কারণ অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ছাড়া মানবাধিকার সুরক্ষা টেকসই হয় না। ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সংগঠনের সুযোগ, সবই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।
বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট যত বাড়ছে, মানবাধিকার ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপও তত দৃশ্যমান হচ্ছে, এটি নিছক কাকতাল নয়।
সরকার, বিরোধী দল ও দ্বৈত বয়ান
এই প্রেক্ষাপটে সরকার ও বিরোধী দলের বয়ান সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকার একে বিদেশি চাপ ও ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরে, বিরোধী দল একে নিজেদের দাবির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখে। এই দ্বৈত বয়ান মানবাধিকার আলোচনাকে আরও রাজনীতিকরণ করছে।
ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগী, সাধারণ নাগরিক-অনেক সময় আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে যায়।
সামনে পথ কী?
মানবাধিকার ইস্যুতে টেকসই সমাধান আসবে না কেবল চাপ বা প্রতিরোধের মাধ্যমে। প্রয়োজন-
মানবাধিকার প্রশ্নে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য অভ্যন্তরীণ সংস্কার
বিচারিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি
আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্মানজনক ও বাস্তববাদী সংলাপ
মানবাধিকারকে রাজনৈতিক অস্ত্র না বানিয়ে নাগরিক অধিকার হিসেবে দেখা
উপসংহার
মানবাধিকার ইস্যুতে পশ্চিমা চাপ বাংলাদেশের জন্য একদিকে চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে সুযোগ। চ্যালেঞ্জ, কারণ এটি সার্বভৌম প্রশ্নে স্পর্শকাতর; সুযোগ, কারণ এটি অভ্যন্তরীণ সংস্কারের দরজা খুলে দেয়। বাস্তবতা ও রাজনীতির এই টানাপড়েন সামাল দিতে পারলেই বাংলাদেশ মানবাধিকার প্রশ্নে চাপের জায়গা থেকে নেতৃত্বের জায়গায় যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত মানবাধিকার কোনো পশ্চিমা ধারণা নয়, এটি বাংলাদেশের নাগরিকের অধিকার। এই সত্য স্বীকার করাই টেকসই কূটনীতির প্রথম