ভোটার অনাস্থা কেন বাড়ছে, দায় কার?

ভোটার অনাস্থা কেন বাড়ছে, দায় কার?

প্রকাশিত

বাংলাদেশের গণতন্ত্রে আস্থার সংকটের গভীর পাঠ

বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা এখন আর কে ক্ষমতায় আসবে, সে প্রশ্ন নয়; বরং প্রশ্ন হলো, ভোটার আদৌ ভোট দিতে আগ্রহী কি না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল পরিসংখ্যানগত নয়, এটি গণতন্ত্রের ভিত্তিগত আস্থার সংকেত বহন করে। ভোটার অনাস্থা কেন বাড়ছে, আর এই দায় কার, রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, নাকি পুরো ব্যবস্থার?

ভোটার অনাস্থা: একটি নীরব কিন্তু গভীর সংকট

ভোটার অনাস্থা মানে কেবল ভোটকেন্দ্রে না যাওয়া নয়; এর অর্থ হলো ভোট দিয়ে কিছু বদলানো যাবে, এই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে শহরাঞ্চলে বিশেষ করে তরুণ ও মধ্যবিত্ত ভোটারের অনুপস্থিতি স্পষ্ট। অনেক কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কোথাও আবার ভোটের আগেই ফলাফল ‘অনুমেয়’, এমন ধারণা জনমনে গেঁথে গেছে।

এই অনাস্থা হঠাৎ তৈরি হয়নি; এটি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ফল।

একতরফা নির্বাচন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভাব

বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে ভোটার অনাস্থার সবচেয়ে বড় কারণ হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন বা সীমিত প্রতিযোগিতার নির্বাচন। যখন বড় রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন থাকে, কিংবা বহু আসনে কার্যত ভোট ছাড়াই ফল নির্ধারিত হয়ে যায়, তখন সাধারণ ভোটারের কাছে নির্বাচন অর্থহীন হয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক সময়ের স্থানীয় সরকার ও উপনির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় ভোটার উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম। কারণ ভোটার জানে, তার ভোট ফল বদলাবে না। এই মনস্তত্ত্বই অনাস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা: সক্ষমতা বনাম আস্থা

নির্বাচন কমিশনের হাতে আইনগত ক্ষমতা থাকলেও জনআস্থার ঘাটতি তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আচরণবিধি লঙ্ঘন, প্রশাসনের ভূমিকা, কিংবা প্রভাবশালী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, এসব ক্ষেত্রে কমিশনের দৃঢ়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার।

যখন ভোটার দেখে, নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগে বড় কোনো দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, তখন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। এই সন্দেহ সরাসরি ভোটার অনাস্থায় রূপ নেয়।

প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

ভোটার অনাস্থার আরেকটি বড় কারণ হলো ভয়ের পরিবেশ। নির্বাচনের সময় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। কোথাও কোথাও ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি মানেই ঝামেলায় পড়ার আশঙ্কা, এমন ধারণা কাজ করে।

বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকাগুলোতে প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণ, কেন্দ্র দখলের অতীত অভিজ্ঞতা কিংবা বিরোধী সমর্থকদের হয়রানির অভিযোগ ভোটারকে ঘরে বসে থাকতে উদ্বুদ্ধ করে।

রাজনৈতিক দলের দায়: ভোটারের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা

রাজনৈতিক দলগুলোও ভোটার অনাস্থার বড় অংশীদার। দীর্ঘদিন ধরে দেখা যাচ্ছে-

  • নির্বাচন এলেই ভোটারকে প্রয়োজন, পরে আর নয়

  • স্থানীয় সমস্যা, দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, এসব ইস্যুতে কার্যকর প্রতিনিধিত্বের অভাব

  • নতুন নেতৃত্ব ও তরুণদের রাজনীতিতে জায়গা না পাওয়া

এর ফলে ভোটার মনে করে, যেই জিতুক, তার জীবনে তেমন কিছু বদলাবে না। এই ‘সবাই একই’ ধারণা গণতন্ত্রের জন্য ভয়ংকর।

তরুণ ভোটার ও প্রথমবারের ভোট: হারানো সম্ভাবনা

বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। কিন্তু এই তরুণ ভোটারদের বড় অংশ রাজনীতি থেকে দূরে। সাম্প্রতিক আন্দোলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও তারা ভোটকে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে দেখছে না। কারণ তারা রাজপথে পরিবর্তনের দাবি দেখে, কিন্তু ব্যালটে সেই প্রতিফলন খুঁজে পায় না।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা

আন্তর্জাতিক মহল বারবার অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছে। কিন্তু ভোটার অনাস্থা কোনো আন্তর্জাতিক চাপের বিষয় নয়; এটি পুরোপুরি অভ্যন্তরীণ সংকট। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন কেবল প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে।

দায় কার?

ভোটার অনাস্থার দায় একক কোনো পক্ষের নয়,

রাষ্ট্র ও সরকার: বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ

নির্বাচন কমিশন: আস্থা পুনর্গঠনে দুর্বলতা

রাজনৈতিক দল: অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অর্থবহ রাজনীতিতে অনীহা

সমাজ : দীর্ঘদিনের হতাশা ও নীরব প্রত্যাহার

এই সমষ্টিগত ব্যর্থতাই ভোটারকে নির্বাক করে তুলেছে।

উত্তরণের পথ

ভোটার অনাস্থা দূর করতে হলে প্রয়োজন-

  • প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন

  • কমিশনের দৃশ্যমান দৃঢ়তা ও নিরপেক্ষতা

  • প্রশাসনের বাস্তবিক নিরপেক্ষ ভূমিকা

  • রাজনৈতিক দলগুলোর দায়বদ্ধতা ও সংস্কার

  • ভোটকে আবার পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে প্রমাণ করা

উপসংহার

ভোটার অনাস্থা কোনো সাময়িক সমস্যা নয়; এটি গণতন্ত্রের গভীর অসুখের উপসর্গ। ভোটার যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন নির্বাচন হয়, কিন্তু গণতন্ত্র হয় না। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন তাই ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং জনগণের আস্থা ফেরানো। কারণ আস্থা ছাড়া ভোট নেই, আর ভোট ছাড়া গণতন্ত্র কেবল কাগজে টিকে থাকে।

logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com