বাংলাদেশের রাজনীতি কি নতুন সামাজিক চুক্তির মুখে?

ক্ষমতা, নাগরিক প্রত্যাশা ও রাষ্ট্র-সমাজ সম্পর্কের পুনর্গঠনের সন্ধিক্ষণ
বাংলাদেশের রাজনীতি কি নতুন সামাজিক চুক্তির মুখে?
প্রকাশিত

রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সম্পর্ক কোনো স্থির চুক্তি নয়; এটি সময়, অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার সঙ্গে বদলায়। যে সমঝোতার ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র শাসিত হয়, অর্থাৎ সামাজিক চুক্তি- তা যখন আর নাগরিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ থাকে না, তখন সমাজ নতুন চুক্তির ইঙ্গিত দিতে শুরু করে।

বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতি ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে কি না, এই প্রশ্ন এখন আর তাত্ত্বিক নয়; এটি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন।

সামাজিক চুক্তি: ধারণা ও বাংলাদেশি প্রেক্ষাপট

সামাজিক চুক্তি বলতে বোঝায়- নাগরিকরা কতটা স্বাধীনতা, কর, আনুগত্য বা নীরবতা রাষ্ট্রকে দেবে; আর বিনিময়ে রাষ্ট্র কতটা নিরাপত্তা, সেবা, ন্যায়বিচার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর যে সামাজিক চুক্তি গড়ে ওঠে, তার মূল উপাদান ছিল-

  • রাজনৈতিক মুক্তি ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব

  • রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উন্নয়ন

  • নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব

কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই চুক্তির ভারসাম্য বদলেছে।

পুরোনো চুক্তির ক্ষয়: কোথায় ভাঙন

বর্তমান বাস্তবতায় নাগরিকরা রাষ্ট্রকে দিচ্ছে-

  • উচ্চ কর ও বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়

  • রাজনৈতিক নীরবতা বা সীমিত অংশগ্রহণ

  • রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা

কিন্তু বিনিময়ে পাচ্ছে-

  • সীমিত রাজনৈতিক অংশগ্রহণ

  • অনিশ্চিত ন্যায়বিচার

  • ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ

এই অসম বিনিময় পুরোনো সামাজিক চুক্তিকে কার্যত অকার্যকর করে তুলছে।

নির্বাচন আর সামাজিক চুক্তির কেন্দ্র নয়

একসময় নির্বাচন ছিল সামাজিক চুক্তির প্রধান আনুষ্ঠানিক রূপ। ভোটের মাধ্যমে নাগরিক সম্মতি নবায়ন হতো। কিন্তু নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল হলে সামাজিক চুক্তির এই স্তম্ভ নড়ে যায়।

বাংলাদেশে নির্বাচন হচ্ছে, কিন্তু তা আর নাগরিক-রাষ্ট্র সম্পর্কের মূল আলোচনার জায়গা নয়।

মানুষ এখন ভোটের চেয়ে বেশি প্রশ্ন করছে- রাষ্ট্র আমার জীবনে কী দিচ্ছে?

উন্নয়ন বনাম অধিকার: নতুন দরকষাকষি

বর্তমান শাসনব্যবস্থা সামাজিক চুক্তিকে পুনর্গঠন করছে উন্নয়নের ভিত্তিতে।

অর্থাৎ-

“রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সীমিত হতে পারে, কিন্তু উন্নয়ন থাকবে।”

এই মডেল কিছু সময়ের জন্য গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করলেও এটি একটি শর্তযুক্ত চুক্তি। যখন উন্নয়ন জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না, তখন এই দরকষাকষি ভেঙে পড়ে।

নতুন নাগরিক শ্রেণি, নতুন প্রত্যাশা

ডিজিটাল যুগে বেড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্ম, নগর মধ্যবিত্ত এবং প্রবাস-নির্ভর অর্থনীতি এক নতুন নাগরিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। এই শ্রেণির প্রত্যাশা-

  • শুধু সেবা নয়, সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ

  • শুধু স্থিতিশীলতা নয়, ন্যায়বিচার

  • শুধু উন্নয়ন নয়, মর্যাদা

পুরোনো সামাজিক চুক্তি এই প্রত্যাশা পূরণে অক্ষম।

নীরবতা মানেই সম্মতি নয়

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নাগরিক নীরবতাকে প্রায়ই সম্মতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

কিন্তু রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানে নীরবতা অনেক সময় ক্লান্তি ও অনাস্থার প্রকাশ।

নীরব সমাজ মানেই সন্তুষ্ট সমাজ নয়; বরং এটি নতুন চুক্তির জন্য জমে থাকা চাপের লক্ষণ।

আন্তর্জাতিক বাস্তবতা ও সামাজিক চুক্তি

বৈশ্বিক অর্থনীতি, মানবাধিকার চাপ এবং ভূরাজনৈতিক হিসাব বাংলাদেশের রাষ্ট্র–নাগরিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত করছে। রাষ্ট্র একদিকে বৈশ্বিক দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি দেয়, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিসর সীমিত রাখে—এই দ্বৈততা সামাজিক চুক্তিকে আরও জটিল করে তুলছে।

নতুন সামাজিক চুক্তির উপাদান কী হতে পারে

যদি বাংলাদেশ নতুন সামাজিক চুক্তির পথে যায়, তবে তার কিছু মৌলিক উপাদান হতে পারে-

  • গ্রহণযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া

  • রাষ্ট্রযন্ত্রের জবাবদিহি

  • অর্থনৈতিক ন্যায্যতা ও সামাজিক সুরক্ষা

  • নাগরিক মর্যাদা ও মতপ্রকাশের নিশ্চয়তা

এটি কোনো বিপ্লবী রূপান্তর নয়; বরং ধীরে ধীরে পুনর্গঠন।

ঝুঁকি: চুক্তি নবায়ন না হলে কী হবে

যদি সামাজিক চুক্তি নবায়ন না হয়, তবে রাষ্ট্র শাসন চালাতে পারবে, কিন্তু শাসন গ্রহণযোগ্য থাকবে না। এই পার্থক্যই সবচেয়ে বিপজ্জনক।

ইতিহাস বলে, গ্রহণযোগ্যতা ছাড়া শাসন টিকে থাকে শক্তির ওপর, আর শক্তিনির্ভর শাসন শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে।

বাংলাদেশের রাজনীতি একটি নতুন সামাজিক চুক্তির মুখে।এটি এখন আর সম্ভাবনা নয়, বাস্তব ইঙ্গিত। প্রশ্ন হলো, এই চুক্তি কি আলোচনার মাধ্যমে নবায়ন হবে, নাকি চাপ ও সংকটের মধ্য দিয়ে?

নাগরিক প্রত্যাশা বদলেছে, সমাজ এগিয়েছে, এখন রাষ্ট্রের পালা সেই বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার।

নতুন সামাজিক চুক্তি মানেই ক্ষমতা হারানো নয়; বরং ক্ষমতার বৈধতা পুনর্গঠন।

ইতিহাসে টিকে থাকে সেই রাষ্ট্রই, যে সময়মতো এই সত্য বুঝতে পারে।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com