ভারত ফ্যাক্টর: প্রতিবেশী রাজনীতির প্রভাব কতটা গভীর?

বাংলাদেশের রাজনীতি, কূটনীতি ও সার্বভৌম বাস্তবতার বিশ্লেষণ
ভারত ফ্যাক্টর: প্রতিবেশী রাজনীতির প্রভাব কতটা গভীর?
প্রকাশিত

বাংলাদেশের রাজনীতি বিশ্লেষণে ‘ভারত ফ্যাক্টর’ একটি অনিবার্য শব্দবন্ধ। ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা, সব মিলিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির বিষয় নয়; এটি সরাসরি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। প্রশ্ন হলো, এই প্রতিবেশী রাজনীতির প্রভাব কতটা গভীর, আর তা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে কতখানি প্রভাবিত করছে?

ইতিহাসের ভার ও বর্তমান রাজনীতি

বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে উঠেছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা দুই দেশের সম্পর্ককে বিশেষ মাত্রা দিলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আবেগ রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়েও পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি বড় অংশ মনে করে, ভারত ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের সূত্রে এক পক্ষের প্রতি বেশি অনুকূল; অন্য পক্ষ মনে করে, এটি বাস্তব কূটনৈতিক স্বার্থের ফল।

এই দ্বিমুখী বয়ানই ‘ভারত ফ্যাক্টর’-কে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্পর্শকাতর ও প্রভাবশালী ইস্যুতে পরিণত করেছে।

নির্বাচন ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্ন

সমসাময়িক বাংলাদেশে নির্বাচন এলেই ভারত প্রসঙ্গ সামনে আসে। কে দিল্লির কাছে গ্রহণযোগ্য, কে নয়, এমন ধারণা রাজনৈতিক বয়ানে প্রবলভাবে উপস্থিত। যদিও ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের কথা অস্বীকার করে, বাস্তবে ভারতের অবস্থান ও বক্তব্য রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হয়।

বিশেষ করে যখন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিয়ে ভারত প্রকাশ্যে উদ্বেগ বা সমর্থন জানায়, তখন তা দেশের ভেতরের ক্ষমতার সমীকরণে প্রভাব ফেলে, সরাসরি না হলেও মনস্তাত্ত্বিকভাবে।

নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা

ভারতের জন্য বাংলাদেশ কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা ও সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সীমান্ত নিরাপত্তা, বিচ্ছিন্নতাবাদ, চোরাচালান ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, এসব কারণে ভারত বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা নিয়ে গভীরভাবে আগ্রহী।

এই নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও ভারতের অবস্থানকে সতর্ক ও স্থিতিশীলতামুখী করে তোলে। সমালোচকদের মতে, এই ‘স্থিতিশীলতা অগ্রাধিকার’ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার চেয়ে ক্ষমতাকেন্দ্রিক বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

অর্থনীতি, সংযোগ ও নির্ভরতার প্রশ্ন

গত এক দশকে বাংলাদেশ–ভারত অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা বহুগুণে বেড়েছে। বিদ্যুৎ আমদানি, ট্রানজিট, রেল–সড়ক সংযোগ, বন্দর ব্যবহার, সব মিলিয়ে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়েছে।

কিন্তু এখানেই জন্ম নিচ্ছে আরেক প্রশ্ন- এই পারস্পরিক নির্ভরতা কি সমতার ভিত্তিতে, নাকি রাজনৈতিক প্রভাবের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে? বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অনেক সময় এই অর্থনৈতিক সম্পর্ককেও ভারতীয় প্রভাবের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

পানি, সীমান্ত ও জনমত

তিস্তা চুক্তি, সীমান্তে হতাহতের ঘটনা, বাণিজ্য ঘাটতি, এসব ইস্যু বাংলাদেশের জনমনে ভারতের প্রতি মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। একদিকে কৌশলগত অংশীদারিত্ব, অন্যদিকে অমীমাংসিত সমস্যার দীর্ঘসূত্রতা, এই বৈপরীত্য রাজনৈতিক দলগুলোর বয়ানে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

ফলে ভারত ফ্যাক্টর কেবল রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নয়, ভোটার মনস্তত্ত্বেও প্রভাব ফেলছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: ভারত বনাম পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি

বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো যেখানে মানবাধিকার, নির্বাচন ও গণতন্ত্রকে অগ্রাধিকার দেয়, ভারত সেখানে বেশি গুরুত্ব দেয় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে। এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বাংলাদেশের ক্ষমতার ভারসাম্যে ভারত একটি আলাদা ও শক্ত অবস্থানে থাকে।

এতে কখনো কখনো বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়ে, একদিকে গণতান্ত্রিক মানদণ্ড, অন্যদিকে আঞ্চলিক বাস্তবতা।

ভারত ফ্যাক্টর কি অতিরঞ্জিত?

একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের জন্য কি সব দায় ভারতের ওপর চাপানো হচ্ছে? অনেক বিশ্লেষকের মতে, ‘ভারত ফ্যাক্টর’ অনেক সময় অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা ঢাকার সহজ ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গণতন্ত্রের দুর্বলতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, এসবের দায় শুধু বাইরের শক্তির ওপর দিলে আত্মসমালোচনার সুযোগ নষ্ট হয়।

সামনে পথ কী?

ভারত বাংলাদেশের জন্য বাস্তবতা, অস্বীকারযোগ্য নয়, আবার সর্বব্যাখ্যাও নয়।

 প্রয়োজন-

  • পরিপক্ব ও আত্মমর্যাদাশীল কূটনীতি

  • জাতীয় স্বার্থে সর্বদলীয় ন্যূনতম ঐকমত্য

  • প্রতিবেশী সম্পর্ককে দলীয় রাজনীতির অস্ত্র না বানানো

  • আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে আলাদা করে দেখা।

ভারত ফ্যাক্টরের প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর- কিন্তু সর্বগ্রাসী নয়। এই প্রভাব তখনই অতিরিক্ত হয়ে ওঠে, যখন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়। শক্তিশালী গণতন্ত্র, স্বচ্ছ নির্বাচন ও দায়িত্বশীল রাজনীতি থাকলে কোনো প্রতিবেশীই অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা ভারতের ভূমিকা নয়; প্রশ্নটা হলো, বাংলাদেশ নিজের রাজনৈতিক ঘর কতটা শক্ত করতে পেরেছে। কারণ শক্ত ঘর থাকলে প্রতিবেশী প্রভাব হয় সহযোগিতা, নিয়ন্ত্রণ নয়।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com