নির্বাচনের বৈধতা বনাম শাসনের স্থিতিশীলতা,কোনটি অগ্রাধিকার পাচ্ছে?

রাষ্ট্রের সমসাময়িক উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা নিয়ে নীতিনির্ধারণী মহলের ভাবনা কি? গণতন্ত্রের ন্যায্যতা না রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা,ক্ষমতার রাজনীতিতে ভারসাম্য কোথায়?
নির্বাচনের বৈধতা বনাম শাসনের স্থিতিশীলতা,কোনটি অগ্রাধিকার পাচ্ছে?
প্রকাশিত

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একটি মৌলিক স্বীকৃতি হলো, নির্বাচনের বৈধতাই শাসনের ভিত্তি। জনগণের ভোটের মাধ্যমে যে ক্ষমতা আসে, সেটিই রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ও রাজনৈতিক অনুমোদন পায়। কিন্তু সমসাময়িক রাজনীতিতে ক্রমেই একটি ভিন্ন বাস্তবতা সামনে আসছে, যেখানে প্রশ্ন উঠছে:

রাষ্ট্র ও ক্ষমতার চর্চায় কি নির্বাচনের বৈধতার চেয়ে শাসনের স্থিতিশীলতাই বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে?

এই দ্বন্দ্ব কেবল তাত্ত্বিক নয়; এটি আজ বাস্তব রাজনীতির কেন্দ্রীয় সংকট।

বৈধতা ও স্থিতিশীলতা: ধারণাগত পার্থক্য

নির্বাচনের বৈধতা মানে-

⦁ জনগণের সম্মতি

⦁ অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন

⦁ ক্ষমতার নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা

অন্যদিকে শাসনের স্থিতিশীলতা বোঝায়-

⦁ প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা

⦁ নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ

⦁ হঠাৎ পরিবর্তন এড়িয়ে চলা

আদর্শ গণতন্ত্রে এই দুইয়ের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব থাকার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে, বিশেষত দুর্বল বা সীমিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, এই দুটি প্রায়ই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়।

কেন স্থিতিশীলতা ক্রমেই অগ্রাধিকার পাচ্ছে?

অস্থিরতার ভয় ও শাসক মানসিকতা

রাজনৈতিক অভিজাতদের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করে-

⦁ ক্ষমতার পরিবর্তন মানেই অস্থিরতা

⦁ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন মানেই ঝুঁকি

⦁ বিরোধিতা মানেই বিশৃঙ্খলা

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নির্বাচনকে দেখা হয় সম্ভাব্য বিপদের উৎস হিসেবে, সমাধানের উপায় হিসেবে নয়।

রাষ্ট্র বনাম সরকার, রেখা ঝাপসা হয়ে যাওয়া

যখন সরকার নিজেকে রাষ্ট্রের সমার্থক ভাবতে শুরু করে-

⦁ সরকার টিকে থাকাই রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা হিসেবে উপস্থাপিত হয়

⦁ ক্ষমতা বদল মানেই রাষ্ট্র দুর্বল হবে, এমন বয়ান তৈরি হয়

ফলে নির্বাচনের বৈধতা গৌণ হয়ে পড়ে, আর শাসনের ধারাবাহিকতাই হয়ে ওঠে মুখ্য যুক্তি।

আন্তর্জাতিক বাস্তবতা ও নিরাপত্তা যুক্তি

বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়-

পশ্চিমা দেশগুলো গণতন্ত্রের কথা বললেও

বাস্তবে তারা ‘স্থিতিশীল অংশীদার’কেই অগ্রাধিকার দেয়

এই বাস্তবতায় শাসকগোষ্ঠী আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে-

“বৈধতা যতটা না দরকার, তার চেয়ে দরকার নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্থিতিশীলতা।”

নির্বাচন যখন স্থিতিশীলতার উপকরণে পরিণত হয়

এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন-

ক্ষমতা বদলের মাধ্যম না হয়ে

ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় রূপ নেয়

নির্বাচন হয়, কিন্তু-

⦁ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সীমিত

⦁ ফলাফল পূর্বানুমেয়

⦁ বিরোধী শক্তি কার্যত অনুপস্থিত

এতে শাসনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, কিন্তু বৈধতার প্রশ্ন অমীমাংসিতই থেকে যায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দ্বন্দ্ব

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে-

⦁ নির্বাচন হচ্ছে, কিন্তু আস্থা তৈরি হচ্ছে না

⦁ সরকার টিকে আছে, কিন্তু রাজনৈতিক ঐকমত্য নেই

⦁ শাসন চলছে, কিন্তু প্রতিনিধিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ

এর ফলে রাষ্ট্র পরিচালনা ক্রমেই নির্ভর করছে-

⦁ প্রশাসনিক শক্তি

⦁ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা

⦁ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ওপর

নির্বাচনের বৈধতা সেখানে হয়ে উঠছে প্রয়োজনীয় কিন্তু অপর্যাপ্ত।

এর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি কোথায়?

বৈধতা সংকট জমে থাকা

স্থিতিশীলতা দিয়ে শাসন চলতে পারে, কিন্তু-

জনগণের সম্মতি ছাড়া

দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাস তৈরি হয় না

এই বৈধতা সংকট একসময় হঠাৎ বিস্ফোরিত হতে পারে।

রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক মৃত্যু

যখন নির্বাচন সমাধান না দেয়-

⦁ রাজনীতি সরে যায় রাস্তায়

⦁ সমঝোতা হয় ক্ষমতার বাইরে

⦁ প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়

এটি গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকেত।

রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ

স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে গিয়ে রাষ্ট্রকে তখন-

⦁ বাড়তি নিয়ন্ত্রণ

⦁ কঠোর আইন

⦁ প্রশাসনিক চাপ

ব্যবহার করতে হয়, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই ভারী ও অকার্যকর করে তোলে।

তাহলে অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?

রাজনৈতিকভাবে টেকসই রাষ্ট্রের জন্য-

নির্বাচনের বৈধতাই স্থিতিশীলতার ভিত্তি হওয়া উচিত, স্থিতিশীলতা বৈধতার বিকল্প নয়।

স্থিতিশীলতা যদি আসে জনগণের সম্মতি থেকে, সেটিই টেকসই।

আর যদি আসে নিয়ন্ত্রণ থেকে, সেটি সাময়িক।

উত্তরণের পথ: দ্বন্দ্ব নয়, সমন্বয়

১. প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন

২. রাজনৈতিক ভিন্নমতের নিরাপত্তা

৩. প্রশাসনের নিরপেক্ষতা

4. নির্বাচন-পরবর্তী অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি

৫. ক্ষমতা বদলকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া

এগুলো ছাড়া বৈধতা ও স্থিতিশীলতার সমন্বয় সম্ভব নয়।

কোনটি আগে, সেটাই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে

রাষ্ট্র যদি মনে করে, স্থিতিশীলতাই সব

তবে নির্বাচন থাকবে, কিন্তু গণতন্ত্র ক্ষয় হবে।

আর যদি রাষ্ট্র মেনে নেয়, বৈধতাই প্রকৃত স্থিতিশীলতার উৎস

তবে নির্বাচন আবার ফিরে পাবে তার আসল রাজনৈতিক ভূমিকা।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই পরিষ্কার-

আমরা কি এমন শাসন চাই, যা স্থিতিশীল দেখায়, নাকি এমন শাসন চাই, যা বৈধ বলেই স্থিতিশীল?

এই প্রশ্নের উত্তরেই লেখা হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com