

ফুটবলকে বলা হয় “দ্য বিউটিফুল গেম”, একটি খেলা, যেখানে আবেগ, গতি আর মুহূর্তের নাটকীয়তা মিলেমিশে তৈরি করে অনন্য অভিজ্ঞতা। কিন্তু আধুনিক ফুটবলে সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি বিতর্কিত শব্দ, VAR (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি)। ন্যায্য সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে চালু হওয়া এই প্রযুক্তি আজ নিজেই বিতর্কের কেন্দ্রে। প্রশ্ন উঠছে- VAR কি ফুটবলকে আরও ন্যায়ভিত্তিক করেছে, নাকি খেলাটার স্বাভাবিক প্রবাহ ও আত্মাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে?
VAR-এর জন্ম: ভুল কমানোর আকাঙ্ক্ষা
VAR চালু হয়েছিল একটি সহজ যুক্তি থেকে, মানুষ ভুল করে, প্রযুক্তি নয়। অফসাইড, পেনাল্টি, লাল কার্ড কিংবা গোলের বৈধতা নিয়ে রেফারিদের ভুল সিদ্ধান্ত বহু ম্যাচের ফলাফল বদলে দিয়েছে ইতিহাস জুড়ে। বিশেষ করে বড় টুর্নামেন্টে একটিমাত্র ভুল সিদ্ধান্ত একটি দলের বছরের পরিশ্রম শেষ করে দিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটেই ফুটবলে প্রযুক্তির সহায়তা আনার সিদ্ধান্ত হয়। VAR-এর উদ্দেশ্য ছিল ‘স্পষ্ট ও গুরুতর ভুল’ সংশোধন করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, প্রযুক্তি যুক্ত হলেও বিতর্ক কমেনি, বরং রূপ বদলেছে।
সিদ্ধান্ত বদলালেও বিতর্ক কেন?
VAR ব্যবহারের পর ফুটবলে ভুল কমেছে, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়েছে ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের জায়গায়। একই ধরনের ফাউল বা হ্যান্ডবলের ঘটনায় এক ম্যাচে পেনাল্টি, আরেক ম্যাচে কিছুই না, এই অসঙ্গতিই বিতর্কের মূল।
VAR সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত মানুষই নেয়। ভিডিও ফুটেজ থাকলেও সেটি কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, সেটি নির্ভর করে রেফারির ব্যাখ্যার ওপর। ফলে প্রযুক্তি থাকলেও সিদ্ধান্তের ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা থেকেই যাচ্ছে। এতে দর্শকের চোখে প্রশ্ন জাগে, তাহলে প্রযুক্তির প্রয়োজনটা কোথায়?
খেলার গতি বনাম ন্যায্যতা
ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি তার প্রবাহ। এক মুহূর্তে গোল, সঙ্গে সঙ্গে উল্লাস, এই তাৎক্ষণিক আবেগই ফুটবলকে আলাদা করে। VAR সেই স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছে। গোল হওয়ার পর উদযাপন থেমে যায়, খেলোয়াড়দের চোখ রেফারির দিকে, দর্শক তাকিয়ে থাকে স্ক্রিনের দিকে।
অনেক সময় ২-৩ মিনিট পর সিদ্ধান্ত আসে, গোল বাতিল। এই বিলম্বিত সিদ্ধান্ত খেলাটার আবেগগত ধারাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রশ্ন ওঠে- একটু ভুল মেনে নেওয়া ভালো, নাকি আবেগহীন নিখুঁততা?
অফসাইড বিতর্ক: মিলিমিটারের বিচার
VAR বিতর্কের সবচেয়ে আলোচিত অংশ অফসাইড সিদ্ধান্ত। খেলোয়াড়ের কাঁধ, হাঁটু বা পায়ের নখ, মিলিমিটার ব্যবধানে অফসাইড ধরা হচ্ছে। প্রযুক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত সঠিক হতে পারে, কিন্তু ফুটবলের দর্শক ও অনেক সাবেক খেলোয়াড়ের মতে এটি খেলাটার মৌলিক দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ফুটবল কি সত্যিই এমন সূক্ষ্ম মাপজোখের খেলা? নাকি অফসাইডের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট সুবিধা নেওয়া ঠেকানো? এই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট না হওয়াতেই বিতর্ক তীব্র হচ্ছে।
খেলোয়াড় ও কোচদের মানসিক চাপ
VAR শুধু দর্শকের অভিজ্ঞতা নয়, খেলোয়াড় ও কোচদের মনস্তত্ত্বেও প্রভাব ফেলেছে। ডিফেন্ডাররা এখন পেনাল্টি বক্সে স্বাভাবিক ট্যাকল করতেও দ্বিধায় পড়ে যায়। সামান্য হাত লাগলেই VAR ডাকে পেনাল্টি হতে পারে, এই ভয়ে খেলোয়াড়রা অস্বাভাবিক আচরণ করে।
কোচদের ক্ষেত্রেও একই চাপ। ম্যাচ পরিকল্পনা ভেঙে যেতে পারে একটি VAR সিদ্ধান্তে। ফলে ফুটবল ধীরে ধীরে ঝুঁকিহীন, হিসাবি খেলায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
দর্শক অভিজ্ঞতা: বিভ্রান্তি ও দূরত্ব
স্টেডিয়ামে বসে থাকা দর্শকদের জন্য VAR আরও জটিল। অনেক সময় তারা জানেই না কী চেক হচ্ছে, কেন খেলা থেমে আছে। টিভিতে রিপ্লে দেখা গেলেও মাঠে থাকা দর্শক তথ্যবঞ্চিত থাকে। এতে মাঠের সঙ্গে দর্শকের সংযোগ দুর্বল হয়।
ফুটবল যেখানে মানুষের খেলাই ছিল, সেখানে অতিরিক্ত প্রযুক্তি দর্শককে খেলার অংশীদার না করে কেবল পর্যবেক্ষকে পরিণত করছে, এমন অভিযোগও বাড়ছে।
তাহলে VAR বাতিল করা শ্রেয়?
VAR পুরোপুরি বাতিল করার পক্ষে খুব কম মানুষই যুক্তি দেন। কারণ এর ইতিবাচক দিকও স্পষ্ট। বড় ভুল কমেছে, অফসাইড বা হ্যান্ডবলের স্পষ্ট অনিয়ম ধরা পড়ছে। সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, সমস্যা ব্যবহারের কাঠামোতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে প্রয়োজন-
নিয়মের ব্যাখ্যা আরও পরিষ্কার করা
অফসাইডে “স্পষ্ট সুবিধা” নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া
সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ
মাঠের দর্শকদের জন্য স্বচ্ছ যোগাযোগ ব্যবস্থা
VAR ফুটবলের শত্রু নয়, আবার নিখুঁত সমাধানও নয়। এটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, কিন্তু সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে সেটিই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফুটবল শুধু ফলাফলের খেলা নয়, এটি অনুভূতির খেলা। ন্যায্যতার পাশাপাশি সেই অনুভূতিকে রক্ষা করাই VAR ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রযুক্তি খেলাটাকে সহায়তা করবে, নিয়ন্ত্রণ নয়। এই ভারসাম্য যতদিন প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন ফুটবলে VAR বিতর্ক চলতেই থাকবে