

সভ্যতার ইতিহাসে কাজের ধরন বদলেছে বহুবার। কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে শিল্পায়ন, তারপর সেবা খাত, প্রতিটি রূপান্তরই শ্রমের মানে নতুন সংজ্ঞা দিয়েছে। এখন বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি বড় মোড়ে- স্মার্ট বাংলাদেশ, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কাজের চরিত্র বদলে দিচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনে মানুষ কোথায় দাঁড়াবে? মেশিনের পাশে, নাকি মেশিনের নিচে?
বাংলাদেশের শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরে তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল-
১) স্বল্প দক্ষতা
২) মানবঘনত্ব
৩) কম মজুরি
গার্মেন্টস, নির্মাণ, কৃষি কিংবা প্রবাসী শ্রম, সব ক্ষেত্রেই মানুষের শারীরিক শ্রমই ছিল মূল শক্তি। কিন্তু স্মার্ট প্রযুক্তির বিস্তারে এই মডেল চাপের মুখে পড়ছে। অটোমেশন এখন শুধু কারখানায় নয়, অফিস, ব্যাংক, মিডিয়া, এমনকি সৃজনশীল পেশাতেও ঢুকে পড়েছে।
এর অর্থ একটাই, সব কাজ আর মানুষের জন্য থাকবে না, কিন্তু সব মানুষও বেকার হবে না।
স্মার্ট বাংলাদেশের শ্রম বাস্তবতায় কাজগুলো ধীরে ধীরে তিন ভাগে ভাগ হচ্ছে-
ডেটা এন্ট্রি, হিসাব–নিকাশ, রুটিন অ্যানালাইসিস, পর্যবেক্ষণ, এসব কাজে এআই ও অটোমেশন মানুষের চেয়ে দ্রুত, সস্তা ও নির্ভুল।
সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সহানুভূতি ও নেতৃত্ব, এই জায়গাগুলোতে মানুষ এখনো অপরিহার্য।
ডাক্তার + এআই ডায়াগনস্টিক, সাংবাদিক + ডেটা টুল, শিক্ষক + এডটেক- ভবিষ্যতের বড় অংশই এই সহযোগিতার।
এই নতুন বিভাজনে শ্রমের মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে দক্ষতা দিয়ে, শারীরিক পরিশ্রম দিয়ে নয়।
স্মার্ট বাংলাদেশের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অবকাঠামো নয়-মানুষের দক্ষতা।
ডিজিটাল টুল ব্যবহারে অনভ্যস্ত
সমস্যা সমাধানমূলক চিন্তায় দুর্বল
পুনঃদক্ষতা (reskilling) সুযোগ থেকে বঞ্চিত
ফলে প্রযুক্তি আসছে, কিন্তু সেই প্রযুক্তিতে কাজ করার মানুষ তৈরি হচ্ছে ধীর গতিতে।
এই ব্যবধান বাড়তে থাকলে কর্মসংস্থান সংকট পরিমাণে নয়, মানে ভয়াবহ হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড গার্মেন্টস শিল্পও এখন স্মার্ট প্রযুক্তির দিকে যাচ্ছে- অটোমেটেড কাটিং, রোবোটিক সেলাই, এআই–ভিত্তিক কোয়ালিটি কন্ট্রোল। এতে উৎপাদন বাড়বে, কিন্তু একই সঙ্গে কম দক্ষ শ্রমের চাহিদা কমবে।
অন্যদিকে বাড়ছে-
ফ্রিল্যান্সিং
গিগ ওয়ার্ক
প্ল্যাটফর্ম–ভিত্তিক কাজ
কিন্তু এই নতুন শ্রম কাঠামোর বড় সমস্যা হলো, নিরাপত্তার অভাব। স্থায়ী চাকরি নেই, সামাজিক সুরক্ষা নেই, শ্রম আইন এখনও এই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায়নি।
স্মার্ট বাংলাদেশে শ্রমের ভবিষ্যৎ শুধু চাকরি পাওয়ার প্রশ্ন নয়; এটি মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
এআই যদি কাউকে বাদ দেয়, দায় কার?
প্ল্যাটফর্ম যদি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়, আপিল কোথায়?
অটোমেশনে কাজ হারালে পুনঃদক্ষতার দায়িত্ব কার?
এগুলো শুধু প্রযুক্তিগত নয়, নীতিগত ও নৈতিক প্রশ্ন, যার উত্তর এখনো অসম্পূর্ণ।
সব ঝুঁকির মাঝেও বাংলাদেশের একটি বড় সুযোগ আছে- তরুণ জনগোষ্ঠী।
যদি এই জনগোষ্ঠীকে-
প্রযুক্তি–বান্ধব শিক্ষা
সমস্যা সমাধানভিত্তিক প্রশিক্ষণ
লাইফলং লার্নিংয়ের সুযোগ
দেওয়া যায়, তাহলে স্মার্ট বাংলাদেশে মানুষ বোঝা নয়, মূল চালিকাশক্তি হবে।
স্মার্ট বাংলাদেশে শ্রমের ভবিষ্যৎ মানে শুধু রোবট আর এআই নয়।
এটা মানুষের ভূমিকা নতুন করে সংজ্ঞায়িত হওয়ার গল্প।
মেশিন কাজ করবে, এটাই বাস্তবতা।
কিন্তু মানুষ সিদ্ধান্ত নেবে, নৈতিকতা দেবে, দিকনির্দেশ দেবে- এটাই ভবিষ্যৎ।
প্রশ্ন তাই এই নয়- মেশিন মানুষকে সরিয়ে দেবে কি না।
প্রশ্ন হলো- আমরা মানুষকে নতুন কাজের জন্য প্রস্তুত করছি কি না।