

বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) থেকে শুরু করে ডিজিটাল সেবা পর্যন্ত নাগরিকের পরিচয় এখন ভার্চুয়াল হয়ে গেছে।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, অনলাইন লেনদেন, সরকারি সেবা, সবকিছুই নির্ভর করছে একটি ডিজিটাল পরিচয়ের ভিত্তিতে। কিন্তু নিরাপত্তা কি সেই পরিচয়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে আসে, নাকি এখানে লুকিয়ে আছে ঝুঁকির একটি গভীর স্তর?
প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ডিজিটাল পরিচয় শুধু সুবিধার নয়, সম্ভাব্য ঝুঁকিরও দরজা খুলে দেয়।
জাতীয় পরিচয়পত্রের ডিজিটাল সংস্করণ নাগরিকদের জন্য দিচ্ছে-
সরকারি সেবা দ্রুততর এবং স্বচ্ছ
ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্স, স্বাস্থ্য সেবা সহজলভ্য
ভোটার রেজিস্ট্রেশন ও নাগরিক তথ্য একত্রিত
অর্থাৎ ডিজিটাল পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকের সুবিধা বাড়াচ্ছে, জীবনকে দ্রুত ও কার্যকর করছে।
তবে সুবিধার সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছে নিরাপত্তার ঝুঁকি, যেগুলো নজরে আসছে কম, কিন্তু গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
ডেটা ব্রিচ ও হ্যাকিং
জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডার (ডেটাবেস) লক্ষ্য করে সাইবার হামলা ঘটতে পারে।
একবার তথ্য ফাঁস হলে নাগরিকের নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, সব কিছু অননুমোদিত হাতে চলে যেতে পারে।
ডেটা ফ্র্যাগমেন্টেশন ও একত্রীকরণের সমস্যা
বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান একই তথ্য ব্যবহার করে।
সিস্টেমগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকলে তথ্য সহজেই সিকিউরিটি গ্যাপের মুখোমুখি হয়।
ফিশিং ও সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
ডিজিটাল পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারকরা অনলাইন লেনদেন বা সরকারি সেবা থেকে ডেটা চুরি করতে পারে।
নাগরিক সচেতন না হলে “নিরাপদ” অ্যাপ বা ওয়েবসাইটেও তথ্য ফাঁস হতে পারে।
বায়োমেট্রিক ঝুঁকি
ফিঙ্গারপ্রিন্ট, আইরিস স্ক্যান—সবই যাচাইয়ের জন্য ব্যবহার হয়।
কিন্তু একবার বায়োমেট্রিক তথ্য ফাঁস হলে, এটি বদলানো সম্ভব নয়। ফলে স্থায়ী ঝুঁকি তৈরি হয়।
ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও অ্যালগরিদম–নির্ভরতা
মুখের চেহারা বা ভয়েস রেকগনিশন ব্যবহার বাড়ছে।
এই প্রযুক্তি উন্নত হলেও ভুল শনাক্তকরণ বা হ্যাকিং ঝুঁকি সবসময় থাকে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল পরিচয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু কাঠামো আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন সীমিত-
সাইবার সিকিউরিটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার দুর্বল
সরকারি ও বেসরকারি সিস্টেমের মধ্যে সমন্বয় নেই।
নাগরিক সচেতনতা সীমিত
মানুষ প্রায়ই ফিশিং ও স্ক্যাম চিনতে পারে না।
আইনগত ফাঁক
তথ্য ফাঁস বা সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে যথাযথ দ্রুত প্রতিক্রিয়া নেই।
ফলে ডিজিটাল পরিচয় সুবিধার সঙ্গে নিরাপত্তার এক নতুন স্তর ঝুঁকি তৈরি করছে।
ডিজিটাল পরিচয় সুবিধা দেয়, কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গেলে-
শক্ত পাসওয়ার্ড ও মাল্টিফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন বাধ্যতামূলক
ডেটা এনক্রিপশন ব্যবহার ও সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট
নিয়মিত সাইবার অডিট এবং হ্যাকিং সিমুলেশন
এই পদক্ষেপ ছাড়া সুবিধা যত বেশি বাড়ে, ঝুঁকি তত বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নাগরিক সুবিধা ও সুরক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখা।
ডিজিটাল পরিচয় মানেই কেবল সুবিধা নয়, নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও আত্মপরিচয়ের অধিকার।
তথ্য ফাঁস হলে ব্যক্তি শুধু আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয় না;
তার পরিচয় ও সামাজিক মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফলে প্রযুক্তির উন্নয়ন শুধুই কাঠামোতে নয়, নৈতিক ও আইনি স্তরে সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞেরা বলেন, সমাধান কেবল প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন-
প্রযুক্তিগত শক্তি
এনক্রিপশন, ফায়ারওয়াল, রিগুলার সিকিউরিটি আপডেট
বায়োমেট্রিক ডেটার নিরাপদ স্টোরেজ
নীতি ও আইনের প্রয়োগ
তথ্য ফাঁস ও সাইবার অপরাধের দ্রুত প্রতিক্রিয়া
ডেটা প্রাইভেসি আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন
নাগরিক সচেতনতা
ডিজিটাল লিটারেসি, নিরাপদ পাসওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা
ফিশিং ও স্ক্যামের বিষয়ে শিক্ষা
ডিজিটাল পরিচয় আমাদের জীবনকে দ্রুত, সহজ এবং সুবিধাজনক করেছে। কিন্তু এই সুবিধার সঙ্গে আসে নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতার দায়িত্ব।
প্রশ্ন তাই শুধু প্রযুক্তির নয়- আমরা কি ডিজিটাল স্বাধীনতা চাই, নাকি অজান্তেই ঝুঁকির একটি ভারসাম্যহীন বিশ্ব গড়ে তুলছি?
ডিজিটাল পরিচয়ই এখন নাগরিকত্বের নতুন স্তর, এবং সেই স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাজ্য, প্রযুক্তি ও নাগরিক, তিনের সমন্বয় ছাড়া অসম্ভব।