ডিজিটাল অবকাঠামো কার নিয়ন্ত্রণে?

সাবমেরিন কেবল থেকে ক্লাউড সার্ভার, তথ্য নির্ভরতার রাজনীতি
ডিজিটাল অবকাঠামো কার নিয়ন্ত্রণে?
প্রকাশিত

রাষ্ট্রের শক্তি এক সময় মাপা হতো সীমান্ত, সেনাবাহিনী আর প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে। আজ সেই তালিকায় নিঃশব্দে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নির্ধারক- ‘ডিজিটাল অবকাঠামো’। ইন্টারনেট সংযোগ, সাবমেরিন কেবল, ডেটা সেন্টার, ক্লাউড সার্ভার, এগুলো আর কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এগুলো এখন ক্ষমতা, সার্বভৌমত্ব ও নির্ভরতার প্রশ্ন।

বাংলাদেশের ‘স্মার্ট’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষার ভেতরে এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে কম আলোচিত অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- আমাদের ডিজিটাল ভিত্তি আসলে কার হাতে?

ডিজিটাল অবকাঠামো: অদৃশ্য কিন্তু অপরিহার্য

ডিজিটাল অবকাঠামো বলতে আমরা যা বুঝি, তা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু তার অনুপস্থিতি মুহূর্তেই সবকিছু থামিয়ে দিতে পারে। ব্যাংকিং, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সবই এখন এই অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে।

এই কাঠামোর মূল স্তম্ভগুলো হলো-

  • আন্তর্জাতিক সাবমেরিন কেবল

  • জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে

  • ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড সার্ভিস

  • সফটওয়্যার ও প্ল্যাটফর্ম ইকোসিস্টেম

এগুলোর যেকোনো একটিতে নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতায় বড় ফাঁক।

সাবমেরিন কেবল: সংযোগের শিরা, নির্ভরতার মূল

বাংলাদেশের ইন্টারনেট সংযোগের বড় অংশই নির্ভর করে সাবমেরিন কেবলের ওপর। এই কেবলগুলো সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে মহাদেশের সঙ্গে দেশকে যুক্ত করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- এই কেবলগুলো বাংলাদেশের মালিকানাধীন নয়, বরং আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম ও বহুজাতিক কাঠামোর অংশ।

ফলে কোনো কারিগরি ত্রুটি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বা বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত সরাসরি দেশের ডিজিটাল সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। এখানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ সীমিত, নির্ভরতা গভীর।

ক্লাউড সার্ভার: ডেটা কোথায় থাকে, সেটাই আসল প্রশ্ন

আজ বাংলাদেশের অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি তথ্য,

  • ইমেইল

  • ব্যাংকিং লগ

  • স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ডেটা

  • নাগরিক তথ্য

সংরক্ষিত থাকে বিদেশি ক্লাউড প্ল্যাটফর্মে।

প্রযুক্তিগতভাবে এটি সুবিধাজনক, কিন্তু কৌশলগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

কারণ ডেটা যেখানে থাকে-

  • সেখানকার আইন প্রযোজ্য হয়

  • সেখানকার নীতিই শেষ কথা

  • রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ সীমিত হয়

এখানেই জন্ম নেয় ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের সংকট।

কর্পোরেট শক্তি বনাম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা

ডিজিটাল অবকাঠামোর বড় অংশ আজ পরিচালিত হয় কয়েকটি বৈশ্বিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। তারা শুধু সেবা দেয় না, তারা নিয়মও তৈরি করে। কোন তথ্য রাখা যাবে, কোনটা মুছে যাবে, কোনটা দৃশ্যমান হবে।

রাষ্ট্র আইন করে, কিন্তু সেই আইন কার্যকর করতে গিয়ে অনেক সময় কর্পোরেট প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য নড়ে যায়।

প্রশ্ন ওঠে-

রাষ্ট্র কি প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করছে, নাকি প্রযুক্তিই রাষ্ট্রকে সীমা বেঁধে দিচ্ছে?

বাংলাদেশের বাস্তবতা: সক্ষমতা বনাম নির্ভরতা

বাংলাদেশ ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ার চেষ্টা করছে- ডেটা সেন্টার, ব্যাকআপ কেবল, নিজস্ব সেবা। কিন্তু বাস্তবতা হলো-

  • প্রযুক্তি আমদানি-নির্ভর

  • সফটওয়্যার ও ক্লাউডে বিদেশি আধিপত্য

  • দক্ষ জনবলের ঘাটতি

ফলে অবকাঠামো আছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজের হাতে নেই। এটি এক ধরনের আধুনিক নির্ভরশীলতা, যা সামরিক নয়, কিন্তু কৌশলগতভাবে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপত্তা, নজরদারি ও গোপনীয়তার দ্বন্দ্ব

ডিজিটাল অবকাঠামো যত শক্তিশালী হয়, ততই বাড়ে নজরদারি ও তথ্য ব্যবহারের ক্ষমতা।

প্রশ্ন হলো- এই ক্ষমতা কার হাতে?

যদি অবকাঠামো রাষ্ট্রের হাতে থাকে, নাগরিক গোপনীয়তা প্রশ্নে ঝুঁকি থাকে।

যদি কর্পোরেটের হাতে থাকে, জবাবদিহি আরও দুর্বল হয়।

এই দ্বন্দ্বের কোনো সহজ সমাধান নেই, কিন্তু স্বচ্ছতা ও আইনগত কাঠামো ছাড়া সমাধান অসম্ভব।

ডিজিটাল অবকাঠামো মানে ভবিষ্যৎ রাজনীতি

আগামী দিনে যুদ্ধ, অর্থনীতি বা কূটনীতি, সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল অবকাঠামো হবে মূল হাতিয়ার।

সংযোগ বন্ধ করা, ডেটা নিয়ন্ত্রণ করা বা প্ল্যাটফর্ম সীমিত করা- এসবই নতুন ক্ষমতার ভাষা।

বাংলাদেশ যদি স্মার্ট হতে চায়, তাহলে বিষয়টা শুধু প্রযুক্তি কেনার নয়।

বরং- কার ওপর কতটা নির্ভর করছি, আর সেই নির্ভরতার মূল্য কী?

শেষ কথা

ডিজিটাল অবকাঠামো নিরপেক্ষ নয়।

যার হাতে অবকাঠামো, তার হাতেই ক্ষমতা।

সাবমেরিন কেবল থেকে ক্লাউড সার্ভার, এই অদৃশ্য শিরাগুলোই ঠিক করে দিচ্ছে রাষ্ট্র কতটা স্বাধীন, নাগরিক কতটা নিরাপদ।

প্রশ্ন তাই একটাই-

আমরা সংযুক্ত হচ্ছি, নাকি ক্রমেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছি?

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com