কোয়ান্টাম কম্পিউটার :ভবিষ্যত বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় বিস্ময়!

আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ?
কোয়ান্টাম কম্পিউটার
কোয়ান্টাম কম্পিউটার
প্রকাশিত

চ্যাটজিপিটি তো কয়েকদিন হলো এলো। তার আগে থেকে বেশ কয়েক বছর ধরেই শোনা যাচ্ছে আরেকটি নাম। সেটি হলো কোয়ান্টাম কম্পিউটার। বলা হচ্ছে, প্রযুক্তি বিশ্বের প্রচলিত সব ধারণা উল্টে-পাল্টে দেবে এই কোয়ান্টাম কম্পিউটার। এই কম্পিউটার নির্মাণ নিয়ে তুমুল প্রতিযোগিতাও চলছে টেকজায়ান্টদের মধ্যে। কিন্তু আসলেই কী কোয়ান্টাম কম্পিউটারের আশীর্বাদে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বিশ্বে? নাকি বয়ে আনবে অভিশাপ?

কোয়ান্টাম কম্পিউটার দেখতে সাধারণ কম্পিউটারের মতো নয়। অনেক ধাতব সিলিন্ডার ও প্যাঁচানো তারে তৈরি কিম্ভূতকিমাকার এই যন্ত্রটি। কোয়ান্টাম মেকানিকসের জটিল সমীকরণ কাজে লাগিয়ে গাণিতিক সব সমস্যার সমাধান করবে এটি।

সাধারণ কম্পিউটার কাজ করে দুটি বাইনারি সংখ্যা ০ ও ১ দিয়ে। এই কম্পিউটারগুলো হয় ০, না হয় ১-এর প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। একসঙ্গে দুটি সংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। আর কোয়ান্টাম কম্পিউটার আলাদা আলাদা করে তো বটেই, একই সময়ে একই সঙ্গে ০ ও ১-এর প্রতিনিধিত্বও করতে পারে। এককথায়, ০ ও ১-এর মধ্যকার বিভিন্ন অবস্থাকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে এই কম্পিউটার। এবং এই কারণে একই সঙ্গে একাধিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে কোয়ান্টাম কম্পিউটার। যেখানে এখনকার প্রচলিত কম্পিউটার একটি কাজ শেষ করে আরেকটি সমাধান করে।

বিশেষ এই কম্পিউটারের মৌলিক একককে বলা হয় কোয়ান্টাম বিটস বা কিউবিটস। প্রথাগত কম্পিউটার বিটসের চেয়ে বহুগুণ বেশি কাজ করতে পারে কিউবিটস। ফলে দুটি কিউবিটস একই সঙ্গে চারটি সংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, তিনটি কিউবিটস করতে পারে আটটি সংখ্যার। এই অবস্থাকে বলা হয় সুপারপজিশন। তত্ত্ব মতে, কোয়ান্টাম মেকানিকসের দুটি কৌশলে কাজ করে কোয়ান্টাম কম্পিউটার। এর একটি হলো সুপারপজিশন। অন্যটি হলো এনট্যাংগেলমেন্ট পদ্ধতি।

গবেষকেরা বলছেন, গণিতের দুর্বোধ্য সব সমস্যা এক তুড়িতে সমাধান করতে পারবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার। মূলত শিল্পখাতে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ব্যবহার বেশি হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। আর সেই ব্যবহার হবে বৈপ্লবিক। বর্তমানের প্রচলিত সুপার কম্পিউটারের চেয়েও অনেকগুণ দ্রুত গতিতে কাজ করতে সক্ষম কোয়ান্টাম কম্পিউটার। গুগল এক পরীক্ষায় দেখেছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রথাগত প্রসেসরের চেয়ে ১০ কোটি গুণ দ্রুত গতিতে কাজ করতে পারে নতুন কোয়ান্টাম কম্পিউটার।

এ কম্পিউটার কী কী পারে, সেই তালিকা বিশাল লম্বা। বিপুল ডেটা নিয়ে নিমেষে বিশ্লেষণের কাজ করতে পারবে এটি। রোগীদের জন্য নিত্যনতুন ওষুধ তৈরি, মৌলিক পদার্থ তৈরির গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন, সামরিক খাতে অস্ত্র তৈরি থেকে শুরু করে যুদ্ধ কৌশল নির্ধারণে সহায়তা, এমনকি নতুন নতুন স্বাদের খাবার সৃষ্টিতেও অবদান রাখতে পারবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার।

নতুন টেকসই নির্মাণসামগ্রী তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার। তথ্যভান্ডারের সুরক্ষা দেওয়ায় এই যন্ত্রের জুড়ি নেই। আবার আবহাওয়া ও পরিবেশ পরিবর্তনের পূর্বাভাসও দিতে পারবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার। পারবে কার্যকর ট্রাফিকব্যবস্থা সৃষ্টি করতে, পানি-গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থাকেও নির্ভুল করা যাবে। এসবই এই কম্পিউটারের আশীর্বাদ।

এসব কারণেই গুগল, আইবিএম, আমাজন ও আলিবাবার মতো বিশাল পুঁজির প্রতিষ্ঠানগুলো গত কয়েক বছর ধরেই কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরিতে আদাজল খেয়ে লেগেছে। এর সঙ্গে আছে অসংখ্য স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানও। বিশেষ করে গুগল ও আইবিএম এই খাতে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ৫৩ কিউবিটসের ‘সিকামোর’ নামে গুগলের এ সংক্রান্ত একটি প্রসেসরও আছে।

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস করপোরেশন বা আইবিএমের আবার এমন বেশ কয়েকটি প্রসেসর তৈরি হয়ে আছে। চলতি বছরই আরেকটি নতুন প্রসেসর তৈরির ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। বর্তমানে আইবিএমের হাতে ৬০টিরও বেশি কোয়ান্টাম কম্পিউটার আছে। এই প্রতিষ্ঠানটির হাতে যে পরিমাণ কোয়ান্টাম কম্পিউটার আছে, বাকি পুরো বিশ্বের হাতে আছে এর কম।

সম্প্রতি ৪৩৩ কিউবিটসের অসপ্রে চিপ নামে সবচেয়ে শক্তিশালী কোয়ান্টাম প্রসেসর দেখিয়েছে আইবিএম। আবার নিজেদের ওপেন সোর্স টুল কিটের মধ্যে ২০টিরও বেশি কোয়ান্টাম কম্পিউটার বিনামূল্যে দিচ্ছে আইবিএম। এরই মধ্যে লক্ষ লক্ষবার ডাউনলোড হয়েছে এগুলো।

এটা অনেকটা প্রথমে ফ্রিতে চা খাইয়ে অভ্যাস গড়ে পরে চায়ের দাম নেওয়ার মতো ব্যাপার। অর্থাৎ বিনামূল্যে দিয়ে হলেও কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে কেন্দ্র করে একটি বিশাল শিল্প গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়ে গেছে এরই মধ্যে এবং এটি করছে আইবিএম।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, অ্যাপল ও মাইক্রোসফটের কাছে ক্লাউড কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টির দৌড়ে পিছিয়ে গিয়ে এখন কোয়ান্টাম কম্পিউটার দিয়ে বাজার মাত করতে চাইছে আইবিএম। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য এর মধ্য দিয়েই আবার প্রযুক্তি দুনিয়ার শীর্ষে যাওয়া।

সব মিলিয়ে কোয়ান্টাম সুপ্রিমেসি অর্জনের দৌড়ে একদিকে যেমন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, অন্যদিকে আছে কয়েকটি দেশও। এ তালিকায় সবার ওপরে আছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে এই দুই দেশের মধ্যেও আছে তুমুল প্রতিযোগিতা।

চীন এরই মধ্যে সরকারিভাবে গত ৪ দশকে এ খাতে ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে রেখেছে। এই প্রযুক্তি শক্তিশালী দেশগুলোর কাছেই এতই গুরুত্ব পাচ্ছে যে, এরই মধ্যে ১৭টি দেশ জাতীয়ভাবে কোয়ান্টাম স্ট্র্যাটেজি তৈরি করে ফেলেছে। আর ৪টি দেশ এটি তৈরির পথে আছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোয়ান্টাম কম্পিউটার খাতে এমন বিপুল আগ্রহের কারণে বিনিয়োগ কেবল বেড়েই চলেছে। ২০২০ সালে বৈশ্বিক কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ ছিল ৪১২ মিলিয়ন ডলার। এটি ২০২৭ সালের মধ্যে সাড়ে ৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে তাহলে ভয়ংকর বলছে কেন কেউ কেউ? কারণ কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ঢের খারাপ দিকও আছে যে। ভুল মানুষের হাতে পড়লে এই কোয়ান্টাম কম্পিউটার হয়ে দাঁড়াবে অসীম দুর্ভোগের কারণ। বর্তমান ইন্টারনেট যে ক্ল্যাসিক ক্রিপ্টোগ্রাফিক ব্যবস্থায় সুরক্ষিত থাকে, তা নিমেষে ভেঙেচুরে একাকার করে দিতে পারবে এটি। তাই এই যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ হ্যাকার বা অপরাধীদের হাতে গেলে, বিশ্ববাসীর কপালে দুঃখ আছে।

কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ও বিভিন্ন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য বেহাত হওয়ার আশঙ্কা আছে। যেভাবে এখনই বিনামূল্যে কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ মিলছে, তাতে বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, ভবিষ্যতে এগুলো অপরাধীরা ব্যবহার করার সুযোগ পেয়ে যাবেন। কারও ডিজিটাল জীবনের আর কোনো সুরক্ষা তখন আর অবশিষ্ট থাকবে না। ইন্টারনেটভিত্তিক অর্থ লেনদেন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যেতে পারবে অসৎ হ্যাকাররা। বিপদে পড়বে ই-কমার্স শিল্প। আবার রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও ও ডেটাবেজও ধসিয়ে দিতে পারবে অপরাধীরা।

এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশনের হোয়্যাটসঅ্যাপে কোনো মেসেজ পাঠালে বা অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থের আদানপ্রদানে মূলত তথ্য সুরক্ষিত থাকে আরএসএ সিস্টেমে। এটি এক ধরনের অ্যাসিমেট্রিক ক্রিপ্টোগ্রাফি অ্যালগরিদম। ভালো মানের একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটার এই ব্যবস্থা কয়েক ঘণ্টায় ভেঙেচুরে শেষ করে দিতে পারে।

গত ডিসেম্বরেই চীনের একদল গবেষক দাবি করেছিলেন যে, তাদের কোয়ান্টাম অ্যালগরিদম এই আরএসএ ব্যবস্থা ভেঙে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। যদিও এই দাবি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে।

সব মিলিয়ে এতটুকু বলাই যায় যে, কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে ঠেকানোর উপায় আবিষ্কার ছাড়াই যদি মানুষ এর তুমুল ব্যবহার শুরু করে দেয়, তবে হয়তো বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে এই পৃথিবীতে। কারণ বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো নিজেদের স্বার্থেই শুরুতে কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে একটি শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত করে ফেলতে পারে, যা দিয়ে যে কাউকে জিম্মি করা যাবে নিমেষে। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনেকটা এরকম – ‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না’!

তথ্যসূত্র: টাইম ম্যাগাজিন, দ্য ইকনোমিস্ট, ফিজ ডট ওআরজি, নিউইয়র্কার ডট কম, ফোর্বস, দ্য টেলিগ্রাফ ও এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ

logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com