

ডিজিটাল উন্নয়ন মানেই নতুন ডিভাইস, দ্রুত আপগ্রেড আর স্মার্ট জীবনের প্রতিশ্রুতি।
কিন্তু এই ঝকঝকে পর্দার আড়ালেই জমে উঠছে এক ভিন্ন বাস্তবতা- পুরোনো ফোন, নষ্ট ল্যাপটপ, বাতিল চার্জার, অচল সার্কিট বোর্ড।
এগুলো আর সাধারণ বর্জ্য নয়; এগুলো ই-বর্জ্য, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমেই বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
প্রশ্নটি তাই আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক-
বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে ডিজিটাল বিশ্বের ফেলে দেওয়া আবর্জনার ভার বহনকারী দেশে পরিণত হচ্ছে?
ই-বর্জ্য বলতে বোঝায় যেসব বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেছে—মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ফ্রিজ, সার্ভার, ব্যাটারি ইত্যাদি।
এই বর্জ্য সাধারণ প্লাস্টিক বা জৈব বর্জ্যের মতো নয়।
কারণ এর ভেতরে থাকে-
সীসা, পারদ, ক্যাডমিয়ামের মতো বিষাক্ত ধাতু
বিপজ্জনক কেমিক্যাল
পুনর্ব্যবহারযোগ্য মূল্যবান ধাতু, যা অনিয়ন্ত্রিতভাবে সংগ্রহ করা হয়
ভুলভাবে ব্যবস্থাপনা হলে এই উপাদানগুলো মাটি, পানি ও মানবদেহে মারাত্মক ক্ষতি করে।
বাংলাদেশে স্মার্টফোন ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহার গত এক দশকে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। কম দামে ডিভাইস পাওয়া যাচ্ছে, আবার দ্রুত নতুন মডেল বাজারে আসছে। ফলে-
ব্যবহারকাল কমছে
রিপেয়ার সংস্কৃতি দুর্বল হচ্ছে
‘ফেলে নতুন কিনি’ মানসিকতা বাড়ছে
এর প্রত্যক্ষ ফল, ই-বর্জ্যের পাহাড়, যার সিংহভাগই থেকে যাচ্ছে অনানুষ্ঠানিক খাতে।
বাংলাদেশে ই-বর্জ্যের বড় অংশ প্রক্রিয়াজাত হয় অনানুষ্ঠানিকভাবে। পুরোনো যন্ত্র ভেঙে মূল্যবান ধাতু বের করা হয় হাতুড়ি, আগুন বা অ্যাসিড ব্যবহার করে, যা শ্রমিকদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
এই শ্রমিকরা-
সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ করেন
বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধাতুর সংস্পর্শে থাকেন
দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন
ডিজিটাল উন্নয়নের মূল্য এখানে এসে পড়ে সবচেয়ে দুর্বল মানুষের ওপর।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে কঠোর পরিবেশ আইন থাকায় ই–বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যয়বহুল। ফলে নানা পথে এই বর্জ্যের একটি অংশ চলে আসে উন্নয়নশীল দেশে আইনের ফাঁক গলে, ‘সেকেন্ড-হ্যান্ড পণ্য’ বা ‘রিফারবিশড ডিভাইস’-এর নামে।
ব্যবহৃত ডিভাইস আমদানির দুর্বল নজরদারি
মান যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতা
পুনর্ব্যবহারের অবকাঠামোর ঘাটতি
ফলে দেশটি একসময় নিজের বর্জ্যের পাশাপাশি অন্যের বর্জ্যও সামলাতে বাধ্য হচ্ছে।
বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নীতিমালা ও নির্দেশনা রয়েছে।
কিন্তু সমস্যাটা হলো-
প্রয়োগ দুর্বল
সমন্বয়হীনতা
শিল্প পর্যায়ে বাধ্যবাধকতার অভাব
প্রডিউসারদের দায় (Extended Producer Responsibility) এখনো কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ফলে ডিভাইস বিক্রি হয়, কিন্তু তার শেষ পরিণতির দায়িত্ব কেউ নেয় না।
ই–বর্জ্যের ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে চোখে পড়ে না, কিন্তু এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী-
বিষাক্ত পদার্থ ভূগর্ভস্থ পানিতে মেশে
কৃষিজমির উর্বরতা কমে
শিশু ও শ্রমিকদের স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়
ডিজিটাল অগ্রগতির এই মূল্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দিতে হলে উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এই সংকট থেকে বেরোতে হলে তিনটি স্তরে কাজ জরুরি-
১. নীতিগত কঠোরতা
ই-বর্জ্য আমদানি, ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিংয়ে স্পষ্ট ও প্রয়োগযোগ্য আইন।
২. শিল্পের দায়বদ্ধতা
ডিভাইস উৎপাদক ও আমদানিকারকদের বাধ্যতামূলক রিসাইক্লিং ব্যবস্থায় যুক্ত করা।
৩. নাগরিক সচেতনতা
ব্যবহারকারীদের জানাতে হবে- ডিভাইস ফেলারও একটি সঠিক পথ আছে।
ডিজিটাল ভবিষ্যৎ কেবল দ্রুত ইন্টারনেট বা স্মার্ট ডিভাইসের গল্প নয়।
এটি দায়িত্ব, পরিবেশ ও মানুষের সুরক্ষার গল্পও।
বাংলাদেশ যদি প্রযুক্তির পথে এগোতে চায়, তবে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে-
সে কি শুধুই ভোক্তা থাকবে, নাকি দায়িত্বশীল অংশীদার হবে?
কারণ উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন তার আবর্জ্যও আমরা সামলাতে পারি।