

প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁয়েছে ইউরোপ। ডেনমার্কের উপকূলে সমুদ্রের তলদেশে আবিষ্কৃত হয়েছে একটি ডুবে যাওয়া ভাইকিং জাহাজ, যা এখন পর্যন্ত পাওয়া ভাইকিং যুগের সবচেয়ে বড় জাহাজ বলে নিশ্চিত করেছেন গবেষকরা। প্রায় ৯২ ফুট দীর্ঘ এবং আনুমানিক ৬০০ বছরের পুরনো এই জাহাজটি মধ্যযুগীয় সামুদ্রিক বাণিজ্যের ইতিহাসে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
পপুলার সায়েন্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজটি একটি কগ—যা সে সময় “সুপার শিপ” হিসেবে পরিচিত ছিল। উন্নত নকশা ও বিপুল বহনক্ষমতার কারণে এই কগ জাহাজগুলো মধ্যযুগীয় ইউরোপে বাণিজ্যের ধরণ আমূল বদলে দিয়েছিল।
এই অভিযানের নেতৃত্বদানকারী প্রত্নতাত্ত্বিক অটো উলডাম এক বিবৃতিতে বলেন,
“এই আবিষ্কারটি সামুদ্রিক প্রত্নতত্ত্বের জন্য একটি মাইলফলক।”
তার ভাষায়, জাহাজটি কেবল একটি নৌযান নয়—বরং এটি মধ্যযুগে জাহাজ নির্মাণ কৌশল, নাবিকদের জীবনযাপন এবং ইউরোপীয় বাণিজ্য ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র তুলে ধরার একটি জীবন্ত দলিল।
চ্যানেলের নাম অনুসারে জাহাজটির নামকরণ করা হয়েছে ‘Svælget 2’।
গবেষকরা জানিয়েছেন, Svælget 2 এত ভালো অবস্থায় থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বালি ও পলির স্তর। শতাব্দী আগে ডুবে যাওয়ার পর জাহাজটি প্রায় ৪০ ফুট পলি ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে, যা সমুদ্রের কঠোর পরিবেশ থেকে একে সুরক্ষা দিয়েছে।
এই প্রাকৃতিক আবরণ শুধু কাঠামোই নয়, জাহাজটির কারচুপি ও দড়ির অংশও সংরক্ষণ করেছে, যা প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় অত্যন্ত বিরল।
উলডাম বলেন,
“কারচুপির এত অংশ থাকা সত্যিই অসাধারণ। আমরা আগে কখনও এটি দেখিনি।”
জাহাজটির কাঠের গাছের আংটি (Tree-ring) বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এটি আনুমানিক ১৪১০ খ্রিস্টাব্দে নেদারল্যান্ডসে নির্মিত হয়েছিল। অর্থাৎ, এটি ভাইকিং যুগের শেষভাগ ও মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় বাণিজ্য বিস্তারের সময়কার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
যদিও এই কগ জাহাজগুলো ছিল বিশাল আকৃতির, তবে এগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হতো খুব অল্প সংখ্যক নাবিক। সংরক্ষিত কারচুপির তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এখন জানতে পারবেন—
কীভাবে অল্প লোক দিয়ে এত বড় জাহাজ চালানো হতো
কীভাবে পাল নিয়ন্ত্রণ ও মাস্তুল স্থির রাখা সম্ভব ছিল
কীভাবে বিপুল মালামাল নিরাপদে বহন করা হতো
উলডাম বলেন,
“কারচুপি ছাড়া একটি মধ্যযুগীয় জাহাজ কিছুই ছিল না।”
এই আবিষ্কারের মাধ্যমে ভাইকিং কগ নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি বিতর্কেরও সমাধান মিলেছে। গবেষকরা জাহাজটির ধনুক ও স্টার্নে কাঠের উঁচু প্ল্যাটফর্ম শনাক্ত করেছেন, যেগুলো ‘দুর্গ’ নামে পরিচিত।
এতদিন এসব দুর্গের অস্তিত্ব কেবল চিত্র ও অঙ্কনের মাধ্যমেই জানা ছিল। এবার প্রথমবারের মতো পাওয়া গেল প্রকৃত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ।
উলডাম বলেন,
“আমাদের কাছে দুর্গের অনেক অঙ্কন ছিল, কিন্তু কখনও বাস্তব নিদর্শন পাওয়া যায়নি—এবার সেটাই মিলল।”
Svælget 2 শুধু একটি ডুবে যাওয়া জাহাজ নয়—এটি মধ্যযুগীয় ইউরোপের বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও সামুদ্রিক দক্ষতার এক অনন্য সাক্ষ্য। এই আবিষ্কার প্রমাণ করেছে যে, শতাব্দী আগে জাহাজ নির্মাতারা নকশা ও সক্ষমতাকে কতটা চরম পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন।
গবেষকদের মতে, এই ‘সুপার শিপ’ ভবিষ্যতে ভাইকিং ও মধ্যযুগীয় সামুদ্রিক ইতিহাস গবেষণায় এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।