

মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত তাম জা’ ব্লু হোল (TJBH) ২০২১ সাল পর্যন্ত রহস্যময়ভাবে গোপন ছিল। বিজ্ঞানীরা এখন দেখেছেন, এটি মহাকাশ থেকে দৃশ্যমান নয়, এবং এটি পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর নীল গর্তের খেতাব ধারণ করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, তাম জা’ ব্লু হোল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,৩৮০ ফুট গভীরে অবস্থিত, যা পূর্বের অনুমান ৯০০ ফুটের চেয়ে ৪৮০ ফুট বেশি। এটি দক্ষিণ চীন সাগরের সানশা ইয়ংলের ব্লু হোল বা ড্রাগন হোলের চেয়ে ৩৯০ ফুট গভীর। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, এই গর্তের তলদেশে এখনও পৌঁছানো যায়নি।
বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষ CTD প্রোব ব্যবহার করেছেন, যা গভীরতা, তাপমাত্রা এবং পরিবাহিতা পরিমাপ করতে সক্ষম। এই প্রোবের মাধ্যমে বাস্তব সময়ে প্রাপ্ত তথ্য নিশ্চিত করেছে যে তাম জা’ ব্লু হোল প্রত্যাশার চেয়ে গভীর এবং তার তলদেশে পৌঁছানো যায়নি।
নীল গর্তের বিভিন্ন স্তরে জল রয়েছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্তরটি ১,৩১২ ফুট গভীরে।
এই স্তরের তাপমাত্রা এবং লবণাক্ততা ক্যারিবিয়ান সাগর এবং কাছাকাছি উপকূলীয় রিফ লেগুনগুলোর মতো।
গবেষকরা মনে করছেন, এটি সুড়ঙ্গ এবং গুহার লুকানো নেটওয়ার্কের কারণে হতে পারে, যা সম্ভবত নীল গর্তটিকে সমুদ্রের সাথে সংযুক্ত করে।
মহাকাশ থেকে অদৃশ্য একটি মহাসাগরীয় অস্বাভাবিকতা
মেক্সিকোর তাম জা' ব্লু হোল সম্পর্কে আরেকটি আকর্ষণীয় তথ্য হল যে যদিও বিশ্বের মহাসাগরগুলি মহাকাশ থেকে ম্যাপ করা হয়েছে, এই গর্তটি ২০২১ সাল পর্যন্ত গোপন ছিল। এটি কখনও উপগ্রহ দ্বারা দেখা যায়নি এবং উপর থেকে কার্যত অদৃশ্য রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ২০২১ সালে এটি সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন যখন স্থানীয় জেলেরা যারা এটি সম্পর্কে জানতেন তারা তাদের বলেছিলেন। এর গভীরতার অর্থ ছিল যে তাদের প্রোবটি নীচে পৌঁছাতে পারেনি, এবং তাদের থামতে হয়েছিল কারণ তাদের CTD প্রোফাইলারের ১,৩৮০ ফুট উচ্চতায় তার শেষ হয়ে গিয়েছিল। এর অর্থ হল গর্তটি "টোয়াইলাইট জোন" এর মতো গভীরে যেতে পারে।
নীল গর্ত কী?
সমুদ্রের এই কাঠামোগুলি একটি অদ্ভুত চিত্র উপস্থাপন করে। এগুলি দেখতে আকর্ষণীয় এবং এখনও মানুষের কাছে একটি রহস্য। গর্তের নীচে যা ঘটে তা একটি গোপন বিষয়, কারণ বিজ্ঞানীরা এই গর্তগুলির তলদেশে পৌঁছানো কঠিন বলে মনে করেন। নীল গর্তগুলি পৃথিবীতে তৈরি গর্তের মতোই সিঙ্কহোল ছাড়া আর কিছুই নয়। স্থলভাগে যেমন ভূমি গুহা তৈরি হয়, তেমনি সমুদ্রেও এটি রয়েছে। তাদের নাম "নীল" শব্দটি বহন করে কারণ এগুলি তাদের চারপাশের অন্যান্য জলের চেয়ে গাঢ় দেখায়। NOAA ওশান এক্সপ্লোরেশন অনুসারে, এই গর্তগুলি খালি নয় এবং বিভিন্ন ধরণের উদ্ভিদ এবং প্রাণীর আবাসস্থল। এগুলি একে অপরের থেকে আলাদা, তবে বিজ্ঞানীরা গভীর খননে খুব বেশি সাফল্য পাননি কারণ এগুলি সহজেই অ্যাক্সেসযোগ্য নয়। এগুলির বেশিরভাগই পৃষ্ঠের কয়েকশ ফুট নীচে শুরু হয় এবং ততটা প্রশস্ত নয়। এই নীল গর্তগুলির মধ্যে কিছুতে এত সরু খোলা জায়গা রয়েছে যে বেশিরভাগ প্রোবগুলি সেগুলিতে প্রবেশ করতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাম জা’ ব্লু হোল নিয়ে গবেষণা—
পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস বোঝার নতুন সূত্র দিতে পারে
সমুদ্রের নিচের গোপন পানিপথ ও গুহা ব্যবস্থার ধারণা স্পষ্ট করবে
ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রের রাসায়নিক ভারসাম্য গবেষণায় সহায়ক হবে
একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে, আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও পৃথিবীতে এমন রহস্য রয়ে গেছে, যা এখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।
তাম জা’ ব্লু হোল শুধু পৃথিবীর গভীরতম নীল গর্তই নয়, এটি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার প্রতীকও। এর অজানা তলদেশ, গোপন সুড়ঙ্গ এবং অদৃশ্য অবস্থান বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। ভবিষ্যতের উন্নত অনুসন্ধান প্রযুক্তিই হয়তো একদিন এই রহস্যের সম্পূর্ণ পর্দা তুলতে পারবে।