

এক সময় উপনিবেশ মানেই ছিল ভূমি, খনিজ, শ্রম আর কাঁচামাল।
আজ সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে নতুন একটি সম্পদ, ডেটা। পার্থক্য শুধু এতটুকু, এই সম্পদ চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি অতীতের যেকোনো সম্পদের চেয়ে বেশি।
বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো আজ ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারে উচ্ছ্বসিত। স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, ক্লাউড সেবা, এআই, সবই উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। কিন্তু এই ডিজিটাল অগ্রযাত্রার আড়ালে একটি প্রশ্ন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে-
আমরা কি কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারকারী, নাকি অজান্তেই ডেটার কাঁচামাল সরবরাহকারী হয়ে উঠছি?
এই বাস্তবতাকেই ব্যাখ্যা করে একটি ধারণা, ডেটা কলোনিয়ালিজম।
ডেটা কলোনিয়ালিজম বলতে বোঝায় এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা, যেখানে-
উন্নয়নশীল দেশগুলোর নাগরিকরা বিপুল পরিমাণ ডেটা তৈরি করে
সেই ডেটা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের নিয়ন্ত্রণ থাকে উন্নত দেশের কর্পোরেট প্ল্যাটফর্মের হাতে
ডেটা থেকে সৃষ্ট মূল্য, মুনাফা ও ক্ষমতা ফিরে যায় না ডেটা-উৎপাদক সমাজে
ঠিক যেমন অতীতে উপনিবেশগুলো কাঁচামাল দিত, আর শিল্পোন্নত দেশগুলো সেই কাঁচামাল থেকে পণ্য ও মুনাফা তৈরি করত, ডেটার ক্ষেত্রেও আজ ঘটছে একই কাঠামোগত অসমতা।
ডিজিটাল অর্থনীতিতে ডেটা হলো-
এআই প্রশিক্ষণের জ্বালানি
বিজ্ঞাপন ও বাজার বিশ্লেষণের মূল উপাদান
আচরণ পূর্বাভাস ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি
একটি সার্চ, একটি লাইক, একটি লোকেশন শেয়ার, সবই ডেটা। উন্নয়নশীল দেশগুলোর কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন ডিজিটাল কার্যকলাপ থেকে তৈরি হচ্ছে বিশাল ডেটা ভান্ডার।
কিন্তু প্রশ্ন হলো,
এই ডেটার মালিক কে?
বাস্তবে দেখা যায়-
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম
ক্লাউড সার্ভিস প্রোভাইডার
এআই ও বিগ টেক কোম্পানি
এই ডেটার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে, যাদের অধিকাংশই উন্নত দেশের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশের মতো দেশে ডিজিটাল সেবা দ্রুত বাড়ছে-
মোবাইল ফাইন্যান্স
ই-গভর্ন্যান্স
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম
সোশ্যাল মিডিয়া ও ই-কমার্স
এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই নাগরিকরা নিয়মিত ডেটা তৈরি করছে।
কিন্তু-
ডেটা কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে?
কোন দেশের আইনের অধীনে সেই ডেটা ব্যবহৃত হচ্ছে?
ডেটা থেকে তৈরি অর্থনৈতিক মূল্য কার হাতে যাচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর প্রায় নেই। ফলে বাংলাদেশ কেবল একটি ডেটা-উৎপাদক ভূখণ্ডে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে, যেখানে মূল্য সংযোজন হয় দেশের বাইরে।
একটি বড় ভুল ধারণা হলো, প্রযুক্তি নিরপেক্ষ। বাস্তবে প্রযুক্তি তৈরি হয়-
নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক স্বার্থে
নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে
নির্দিষ্ট আইনি পরিবেশে
যে দেশ বা কর্পোরেশন প্রযুক্তির মালিক, তারাই ঠিক করে-
কোন ডেটা গুরুত্বপূর্ণ
কীভাবে বিশ্লেষণ হবে
কোন সিদ্ধান্তে ডেটা ব্যবহার হবে
ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামাজিক বাস্তবতা বিশ্লেষিত হয় অন্যের অ্যালগরিদমে, অন্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে।
ডেটা কলোনিয়ালিজম কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।
নাগরিক আচরণ বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক প্রবণতা বোঝা সম্ভব
বাজার আচরণ থেকে অর্থনীতির গতিপথ অনুমান করা যায়
সামাজিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করে নীতি প্রভাবিত করা যায়
যদি এই ক্ষমতা বিদেশি কর্পোরেট প্ল্যাটফর্মের হাতে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
এই অসমতার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে-
ডেটা গভর্ন্যান্সের দুর্বলতা
স্থানীয় প্রযুক্তি ও ক্লাউড অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা
আইন ও নীতির অস্পষ্টতা
বিগ টেকের সাথে অসম দরকষাকষির ক্ষমতা
ফলে ডেটা ব্যবহারের শর্ত নির্ধারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রায়ই প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকে।
ডেটা কলোনিয়ালিজম ঠেকাতে প্রয়োজন কেবল প্রযুক্তি নয়, রাজনৈতিক ও নীতিগত সিদ্ধান্ত।
ডেটা লোকালাইজেশন ও সার্বভৌম ডেটা নীতি
স্বচ্ছ ডেটা শেয়ারিং ফ্রেমওয়ার্ক
স্থানীয় ক্লাউড ও এআই সক্ষমতা তৈরি
নাগরিক ডেটা অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ডেটাকে উন্নয়নের কাঁচামাল নয়, জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখা।
ডিজিটাল যুগে উপনিবেশ আর জাহাজে করে আসে না; আসে অ্যাপ, প্ল্যাটফর্ম আর সার্ভারের মাধ্যমে। ডেটা কলোনিয়ালিজম কোনো তাত্ত্বিক ধারণা নয়, এটি একটি চলমান বাস্তবতা।
প্রশ্ন তাই প্রযুক্তি গ্রহণের নয়, প্রশ্ন হলো-
এই প্রযুক্তির বিনিময়ে আমরা কী দিচ্ছি, আর কী পাচ্ছি?
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ভবিষ্যতের লড়াই হবে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের নয়, ডেটার ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার।