

প্রযুক্তির ইতিহাস একসময় ছিল মুক্ত ও সহযোগিতার গল্প। ইন্টারনেট, ই–মেইল, ওয়েব, সবই গড়ে উঠেছে ওপেন স্ট্যান্ডার্ড ও শেয়ারিং সংস্কৃতির ওপর। কিন্তু আজকের প্রযুক্তি জগৎ দেখলে মনে হয় ভিন্ন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। অল্প কয়েকটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে জমা হয়েছে ডেটা, অবকাঠামো ও সিদ্ধান্তের ক্ষমতা। এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন আবার সামনে আসছে-
প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ কি সত্যিই কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণেই আটকে থাকবে, নাকি ওপেন সোর্স বিকল্প দিতে পারে একটি ভিন্ন পথ?
ওপেন সোর্স মানে কেবল কোড ফ্রি নয়। এর মূল দর্শন হলো-
যে কেউ কোড দেখতে পারবে
পরিবর্তন করতে পারবে
নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারবে
লিনাক্স, ফায়ারফক্স, অ্যান্ড্রয়েডের বড় অংশ, এমনকি ইন্টারনেটের অনেক ভিত্তিই ওপেন সোর্সের ওপর দাঁড়িয়ে। এখানে ক্ষমতা থাকে কমিউনিটির হাতে, কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নয়।
গুগল, অ্যাপল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, মেটা, এই কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আজ-
অপারেটিং সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করে
ক্লাউড অবকাঠামো চালায়
এআই ও ডেটা বিশ্লেষণের মূল হাতিয়ার ধরে রেখেছে
বিগ টেক ব্যবহারকারীদের দেয় দ্রুত সেবা, নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম ও সুবিধাজনক অভিজ্ঞতা। কিন্তু এর বিনিময়ে তৈরি হয়-
একচেটিয়া নির্ভরতা
ডেটার ওপর কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ
ব্যবহারকারীর পছন্দ সীমিত হয়ে যাওয়া
এই বিতর্কের কেন্দ্রে আছে একটি প্রশ্ন, কার হাতে থাকবে নিয়ন্ত্রণ?
বিগ টেকের ক্ষেত্রে:
সিদ্ধান্ত নেয় কোম্পানি, ব্যবহারকারী মানিয়ে নেয়
ওপেন সোর্সে:
ব্যবহারকারী ও ডেভেলপার মিলেই সিদ্ধান্তের অংশ
বিগ টেক যেখানে “লক-ইন” তৈরি করে, ওপেন সোর্স সেখানে বিকল্পের সুযোগ রাখে।
অনেকের ধারণা, ওপেন সোর্স মানে নিরাপত্তা কম। বাস্তবে বিষয়টি উল্টো-
ওপেন সোর্সে কোড খোলা থাকায় ত্রুটি দ্রুত ধরা পড়ে
নিরাপত্তা নির্ভর করে কমিউনিটি ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর
বিগ টেকে কোড বন্ধ থাকলেও ত্রুটি থেকে যায় অজানা
অর্থাৎ নিরাপত্তা আসলে মডেলের নয়, ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।
এআই প্রযুক্তি এই দ্বন্দ্বকে আরও জটিল করেছে।
বিগ টেকের হাতে আছে বিশাল ডেটা ও কম্পিউটিং শক্তি
ওপেন সোর্স এআই মডেল স্বচ্ছতা ও বিকেন্দ্রীকরণের সুযোগ দেয়
প্রশ্ন উঠছে, এআই কি কয়েকটি কর্পোরেট ল্যাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ওপেন কমিউনিটিতেও বিকশিত হবে?
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই বিতর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিগ টেক নির্ভরতা মানে দীর্ঘমেয়াদি খরচ
ওপেন সোর্স মানে স্থানীয় দক্ষতা তৈরি
ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও এখানে জড়িত
নিজস্ব প্রযুক্তি সক্ষমতা গড়তে ওপেন সোর্স হতে পারে একটি কৌশলগত পথ।
ওপেন সোর্সের সীমাবদ্ধতাও আছে-
দীর্ঘমেয়াদি ফান্ডিংয়ের অভাব
ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা
কর্পোরেট মার্কেটিং শক্তির ঘাটতি
ফলে অনেক ওপেন সোর্স প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বিগ টেকের ছায়ায় চলে যায়।
বাস্তবতা হলো, ভবিষ্যৎ হয়তো একচেটিয়া কোনো মডেলের নয়।
বিগ টেক অবকাঠামো দেবে
ওপেন সোর্স দেবে স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা
রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা হবে ভারসাম্য রক্ষা করা
প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই ভারসাম্যের ওপর।
ওপেন সোর্স বনাম বিগ টেক বিতর্ক আসলে কোডের নয়, ক্ষমতার প্রশ্ন।
আমরা যদি প্রযুক্তিকে কেবল সুবিধার চোখে দেখি, কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ স্বাভাবিক মনে হবে।
কিন্তু যদি প্রযুক্তিকে স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও গণতন্ত্রের হাতিয়ার হিসেবে দেখি, তাহলে ওপেন সোর্সের গুরুত্ব নতুন করে ভাবতে হবে।
প্রশ্ন তাই একটাই-
আমরা কি ব্যবহারকারী থাকব, নাকি অংশীদার হব?