

এক সময় মানুষ পরিচিত হতো মুখে-মুখে, কাজে-কর্মে, সমাজে অবস্থানের মাধ্যমে। আজ মানুষ প্রথমে পরিচিত হয়, প্রোফাইল দিয়ে। নামের আগে ফলোয়ার, চরিত্রের আগে কনটেন্ট, আর উপস্থিতির আগে অনলাইন অ্যাক্টিভিটি। এই রূপান্তরের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন সত্তা- ভার্চুয়াল সেলফ।
প্রশ্নটা হল-
অনলাইন উপস্থিতি কি আমাদের বাস্তব সত্তার পরিপূরক, নাকি ধীরে ধীরে তার বিকল্প হয়ে উঠছে?
ইন্টারনেটের শুরুর দিনে অনলাইন পরিচয় ছিল নামহীন- ইউজারনেম, ছদ্মনাম, সীমিত যোগাযোগ। সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচয় বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করে। ছবি, অবস্থান, মতামত, অনুভূতি, সবকিছুই ডিজিটাল ছাপ রেখে যেতে থাকে।
এইভাবে গড়ে ওঠে ভার্চুয়াল সেলফ-
একটি নির্বাচিত, সম্পাদিত ও উপস্থাপিত সত্তা, যা অনেক সময় বাস্তব জীবনের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান, বেশি সক্রিয়।
আজ অনুপস্থিত থাকা মানে অনেক সময় অদৃশ্য হয়ে যাওয়া।
মেসেজের রিপ্লাই, স্টোরি আপডেট, অনলাইন স্ট্যাটাস, এসবই সামাজিক অস্তিত্বের মাপকাঠি হয়ে উঠেছে।
এই চাপ একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে-
মানুষ এখন শুধু বাঁচে না, ডকুমেন্ট করে
অনুভূতি আগে অনুভব হয় না, আগে পোস্টযোগ্য হয়
অভিজ্ঞতার মূল্য নির্ধারিত হয় এনগেজমেন্ট দিয়ে
ফলে বাস্তব মুহূর্ত অনেক সময় ভার্চুয়াল স্বীকৃতির অপেক্ষায় আটকে যায়।
ভার্চুয়াল সেলফ কখনোই সম্পূর্ণ বাস্তব নয়। এটি একটি কিউরেটেড সত্তা, ভালো দিকগুলো সামনে, দুর্বলতা আড়ালে। এই নির্বাচনী উপস্থাপনাই ধীরে ধীরে পারফরমেটিভ হয়ে ওঠে।
সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন-
মানুষ নিজের মূল্যায়ন করে লাইক ও ভিউ দিয়ে
আত্মসম্মান নির্ভর করে অ্যালগরিদমের ওপর
নীরবতা বা অনলাইন বিরতি অপরাধবোধ তৈরি করে
বাস্তব মানুষ ক্লান্ত হয়, কিন্তু ভার্চুয়াল সেলফ থামতে পারে না।
গবেষণা দেখাচ্ছে, দীর্ঘ সময় অনলাইন উপস্থিতি বজায় রাখার চাপ-
উদ্বেগ
আত্মতুলনা
একাকীত্ব
আত্মপরিচয়ের বিভ্রান্তি
এই সমস্যাগুলোকে তীব্র করে তোলে। বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে, ভার্চুয়াল সেলফের সঙ্গে বাস্তব সত্তার ফাঁক যত বাড়ে, মানসিক অস্থিরতাও তত গভীর হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। কারণ এখানে ডিজিটাল গ্রহণ দ্রুত হলেও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা এখনও সীমিত।
ভার্চুয়াল সেলফ শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের ফল নয়।
সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম ঠিক করে-
কোন দিকটা বেশি দেখানো হবে
কোন আচরণ পুরস্কৃত হবে
কোন কনটেন্ট উপেক্ষিত হবে
ফলে ব্যক্তি ধীরে ধীরে নিজের মতো নয়, অ্যালগরিদম–বান্ধব মানুষে রূপ নেয়। মতামত, রুচি, এমনকি ব্যক্তিত্বও ডিজিটাল প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে বদলে যেতে থাকে।
সবকিছুই যে নেতিবাচক, তা নয়। ভার্চুয়াল সেলফ-
কণ্ঠহীনদের কণ্ঠ দিয়েছে
প্রান্তিক পরিচয়কে দৃশ্যমান করেছে
দূরত্ব কমিয়েছে
সমস্যা তখনই, যখন ভারসাম্য ভেঙে যায়।
যখন মানুষ বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, কাজ, নীরবতা ও সীমাবদ্ধতাকে তুচ্ছ করে শুধু অনলাইন অস্তিত্বে নিজেকে খুঁজে ফেরে।
সমাধান ডিজিটাল ডিটক্সের স্লোগানে নেই।
সমাধান আছে-
অনলাইন উপস্থিতির সঙ্গে অফলাইন সত্তার সমন্বয়ে
পারফরম্যান্স নয়, প্রামাণিকতায়
অ্যালগরিদমের চেয়ে নিজের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়ায়
ভার্চুয়াল সেলফকে যদি আমরা পরিচয়ের একমাত্র কেন্দ্র বানাই, তাহলে বাস্তব সত্তা সংকুচিত হবেই।
ভার্চুয়াল সেলফ আমাদের তৈরি, কিন্তু ধীরে ধীরে সে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে।
প্রশ্ন তাই প্রযুক্তির নয়, প্রশ্ন আমাদের সাহসের:
আমরা কি অনলাইনের বাইরে থেকেও নিজেকে স্বীকৃতি দিতে পারি?
কারণ মানুষ শুধু দৃশ্যমান সত্তা নয়-
মানুষ নীরবতা, সীমা ও অসম্পূর্ণতার মধ্যেই সবচেয়ে বাস্তব।